বান্দরবান প্রতিনিধি
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে সপ্তাহজুড়ে চলা প্রলয়ঙ্করী ও অবিরাম ভারী বর্ষণের জেরে সৃষ্ট এক ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। মাটি ও বিশাল আকৃতির গাছ উপড়ে পড়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে এক অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। তবে খবর পাওয়া মাত্রই কোনো বিলম্ব না করে দুর্যোগকালীন জরুরি সেবায় মাঠে নামে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) হিল ভিডিপি শাখার একদল সাহসী সদস্য। তাদের প্রবল ও তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযানের মুখে সড়কের ওপর জমা হওয়া টন টন মাটি ও গাছপালা অপসারণ করে পুনরায় পথটি সচল ও যান চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এক রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, গত রবিবার সন্ধ্যার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় মুষলধারে চলা বৃষ্টির কারণে সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রধানঝিরি থেকে জামছড়িগামী সংযোগ সড়কের ওপর একটি বিশাল পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে। পাহাড়ের মাটি ও বিশাল সব গাছপালা ভেঙে সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যেই পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে ওই এলাকার বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পাহাড়ি অঞ্চলের একমাত্র চলাচলের পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা এবং চিকিৎসার মতো জরুরি কাজগুলোও থমকে দাঁড়ায়।
আজ সোমবার ভোরের দিকে এই চরম দুর্ভোগের বিষয়টি প্রথম জানাজানি হলে উপজেলা সহকারী কোম্পানি কমান্ডার মোহাম্মদ যোবাইয়ের হোসেন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পুরো বিষয়টি উপজেলা আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষক আশু বড়ুয়াকে অবহিত করেন। ঘটনাটি জানার পর আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট, বান্দরবানের বিশেষ ও জরুরি নির্দেশনায় দ্রুত একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল গঠন করা হয়। এরপরই সহকারী কোম্পানি কমান্ডার মোহাম্মদ যোবাইয়ের হোসেনের প্রত্যক্ষ কমান্ড ও নেতৃত্বে হিল ভিডিপির একঝাঁক তরুণ ও প্রশিক্ষিত সদস্য কোদাল, দা এবং গাছ কাটার আধুনিক করাত নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সকালের দিকে প্রবল বৃষ্টির তোড় উপেক্ষা করে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সড়কের ওপর জমে থাকা কাদা-মাটি সরানো এবং উপড়ে পড়া গাছপালা কেটে সড়ক পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। তাদের সুসমন্বিত, ক্লান্তিহীন ও সম্মিলিত দলগত প্রচেষ্টায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধানঝিরি-জামছড়ি সড়কটি থেকে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হয় এবং অবরুদ্ধ পাহাড়ের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল পুনরায় শুরু হয়।
এই মানবিক ও সফল উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে উপজেলা সহকারী কোম্পানি কমান্ডার মোহাম্মদ যোবাইয়ের হোসেন বলেন, “সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় পাহাড়ধসের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। আমাদের লক্ষ্যই ছিল হিল ভিডিপির সদস্যদের নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বিশাল এই মাটির স্তূপ সরিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে আনা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা।” অন্যদিকে, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষক আশু বড়ুয়া বলেন, “বান্দরবান জেলা কমান্ড্যান্টের দ্রুত ও কার্যকর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মাঠে নেমেছিলাম। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা দেওয়াটাই বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির অন্যতম প্রধান সাংগঠনিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। ভবিষ্যতেও পার্বত্য অঞ্চলের যেকোনো জরুরি বা সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে আমরা একইভাবে সাধারণ মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়তে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছি।” এদিকে হিল ভিডিপির এই তাৎক্ষণিক ও নিঃস্বার্থ উদ্ধার কাজে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করেছেন।