সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংসকারী ভাইরাস বা এইচআইভির সংক্রমণ। এ বছর নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক তরুণ জড়িয়ে পড়েছেন মরণব্যাধি এই এইডস রোগে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই স্থানীয় বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সমকামী সম্পর্কের অসচেতনতার কারণে তাঁরা এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন রোগীদের বাইরে একটি অংশ বিদেশফেরত প্রবাসী নাগরিক বলেও জানা গেছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত যশোর জেলায় মোট ৩১০ জন এইচআইভি পজিটিভ বা এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ মানসিক পরামর্শ বা কাউন্সেলিং এবং ভাইরাসরোধী বা অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (এআরটি) চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যথাযথ সময়ে রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং শারীরিক জটিলতার কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতোমধ্যে ৯ জন আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া প্রশাসনের নজরদারির বাইরে চলে গিয়ে বর্তমানে ১১ জন আক্রান্ত রোগী সম্পূর্ণ আত্মগোপনে রয়েছেন, যা স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থেকে সরকারি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন ২৯০ জন নিবন্ধিত রোগী।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, চলতি বছরের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে জেলায় নতুন করে আরও ৪৮ জন ব্যক্তির শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ৩৫ জনই স্থানীয় বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যাঁরা নিজেদের অসচেতনতায় সমকামী শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে এই ব্যাধি ডেকে এনেছেন। বাকি ১৩ জন আক্রান্ত ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সদ্য ফেরত আসা প্রবাসী কর্মী।
চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী স্বপ্নীল শুভ্র (ছদ্মনাম) জানান, বিসিএস কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ক্যাম্পাসের সামনে একটি ইন্টারনেট ও অনলাইন কাজের দোকানের এক কর্মীর সাথে পরিচয়ের সূত্রে চরম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সেই ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে একপর্যায়ে তিনি সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এই চক্রের মাধ্যমে মেসে বসবাসরত আরও তিন রুমমেট এই মরণব্যাধির শিকার হন। দীর্ঘ ৯ থেকে ১০ মাস পর শরীরে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা, অনবরত জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, দ্রুত শরীরের ওজন হ্রাস, ক্ষুধামন্দা ও রক্ত পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিলে তাঁরা যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের এইডস ট্রেনিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং (এটিসি) বিভাগে পরীক্ষা করান এবং রিপোর্টে তাঁদের এইডস পজিটিভ আসে।
অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা জানান যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন (ছদ্মনাম)। তিনি মণিহার মোড়সহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আড্ডার সূত্রে কিছু তরুণের সাথে পরিচিত হয়ে সমকামী সম্পর্কের জালে জড়ান। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন যে, আধুনিক স্মার্টফোন অ্যাপ এবং বিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক গোপন গ্রুপকে কেন্দ্র করে জেলায় একটি বিশাল সমকামী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সাংকেতিক নামে পরিচালিত এসব গোপন গ্রুপে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজারের বেশি, যেখানে তরুণদের প্রতিনিয়ত অনিরাপদ যৌন আচরণে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করা হচ্ছে, যার ফলে জেলায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে এই মারাত্মক ভাইরাসের সংক্রমণ।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, পারিবারিক ও সামাজিক অসচেতনতার কারণে অনেক তরুণ বন্ধুদের কুসংসর্গে পথ হারিয়েছেন, আবার কেউ কেউ হিজড়া সম্প্রদায়ের আর্থিক প্রলোভন ও প্ররোচনায় পড়ে এটিকে একপ্রকার উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিটি কলেজের দুই শিক্ষার্থী আকিব হাসান ও আকাশ সাফফাত (ছদ্মনাম) মণিহার মোড়ে আড্ডার সময়ে এমনই এক হিজড়া চক্রের খপ্পরে পড়ে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে চরম অনিশ্চিত জীবন পার করছেন। আক্রান্ত তরুণরা পরিবার ও সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মেসে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর আতঙ্কে ভুগছেন।
যশোরে তরুণ ও যুবসমাজের একাংশের মধ্যে এমন সামাজিক অবক্ষয় ও রোগ ছড়ানোর ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল, অভিভাবক এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। এক সময় দেশে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ বিজ্ঞাপন, দেয়ালিকা, সচেতনতামূলক পোস্টার ও ব্যাপক মাইকিংয়ের মাধ্যমে যেভাবে এইচআইভি প্রতিরোধের প্রচারণা চালানো হতো, বর্তমানে তা ডিজিটাল যুগে এসে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশই এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও সঠিক ধারণা রাখছে না।
এই গুরুতর বিষয়ে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন তাঁর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর এক বড় ধরনের অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। তবে আমাদের সমাজকে একটি বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে বুঝতে হবে যে, এইচআইভি আক্রান্ত হওয়া মানেই সেই ব্যক্তিটি খারাপ চরিত্রের অধিকারী—এমন প্রাচীন ও সংকীর্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ অসচেতনতা, রক্তের আদান-প্রদান বা অন্য কোনো চিকিৎসার ভুল পদ্ধতির কারণেও একজন নিরীহ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। সমাজ যদি আক্রান্তদের ঘৃণা করে দূরে ঠেলে দেয়, তবে নতুন রোগীরা সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখবেন। এর ফলে সংক্রমণের মূল উৎস খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং তা মহামারীর রূপ নেবে। তাই শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং আধুনিক তরুণ বা জেনারেশন-জেডের উপযোগী নতুন স্লোগান তৈরি করে প্রচার জোরদার করতে হবে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা এ বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে জানান, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) নামক ওষুধ সেবন করলে একজন এইচআইভি পজিটিভ বা এইডস আক্রান্ত রোগীও সাধারণ মানুষের মতো দীর্ঘ ও স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পেতে পারেন। তবে তিনি চিকিৎসকের পাশাপাশি মা-বাবাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্তানরা বাইরে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী করছে, সে বিষয়ে প্রতিটি পরিবারকে অত্যন্ত সতর্ক নজরদারি রাখতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং এই সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রেরও অনেক দায় রয়েছে।
আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরে এইচআইভি সংক্রমণ এভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। যেহেতু আক্রান্তদের একটি বিশাল অংশই তরুণ শিক্ষার্থী, তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা বাড়ানো এবং স্বেচ্ছায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরিধি আরও ব্যাপক করা জরুরি। এই রোগ হঠাৎ ছড়ায় না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্ত অবস্থায় বিস্তার লাভ করে। তাই গোপনীয়তা বজায় রেখে বেশি বেশি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের একক প্রচেষ্টায় এই নীরব ঘাতক ব্যাধি প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সর্বাত্মক সামাজিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। জেলার সব উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ও চিকিৎসকদের ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তরুণ শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজন করা হবে। এছাড়াও প্রতিটি এলাকার সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জেলার প্রতিটি মসজিদের ইমামদের কাছে চিঠি পাঠানো হবে, যাতে তাঁরা পবিত্র জুমার খুতবায় এইডস ও অনৈতিক সম্পর্কের কুফল এবং জনসচেতনতামূলক বার্তা সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে নিয়মিত প্রচার করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যশোর একটি সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে দেশী-বিদেশী মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড অনেক বেশি। তাই সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে অনতিবিলম্বে বিশেষ স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র, উন্নত কাউন্সেলিং এবং সরকারি চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য ও জোরদার করা সময়ের দাবি। আক্রান্তদের প্রতি কোনো ধরনের সামাজিক বৈষম্য বা অবহেলা না করে, তাঁদের প্রতি মানবিক সহমর্মিতা প্রদর্শন এবং দ্রুত সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই হবে সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।