ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে যাচ্ছে, ম্যাচের নির্ধারিত সময় প্রায় শেষের পথে। রেফারিও মুখে বাঁশি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। ঠিক এমন মুহূর্তে দলের জন্য একটি মহামূল্যবান গোলের বড্ড প্রয়োজন? স্প্যানিশ ডাগআউটে বসা কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের একদমই চিন্তার কিছু নেই, কারণ তাঁর স্কোয়াডে আছেন এক বিশেষ ‘ম্যাজিক ম্যান’—মিকেল মেরিনো! চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ দুটি ম্যাচেই এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলেই টানা জয় পেয়ে সেমিফাইনালে পা রেখেছে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে জয়সূচক একমাত্র গোল কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলের চোখ ধাঁধানো জয়—দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই স্পেনের ত্রাতা বা মুশকিল আসান হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন মিকেল মেরিনো। সবচেয়ে অবাক করা পরিসংখ্যান হচ্ছে, এই দুটি ম্যাচেই তিনি মাঠে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র কয়েক মিনিট (যথাক্রমে পাঁচ ও চার মিনিট)। বদলি বা ‘সুপার-সাব’ হিসেবে ম্যাচের একেবারে অন্তিম লগ্নে মাঠে নেমে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিচ্ছেন তিনি, যা নিয়ে বর্তমান ফুটবল বিশ্ব জুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা।
বিগত তিন মৌসুমে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল সোসিয়েদাদ ও ইংলিশ পরাশক্তি আর্সেনালের হয়ে ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চ মিলিয়ে ম্যাচের ৮০ মিনিটের পর মোট ১২টি গোল করার অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন এই মিডফিল্ডার। মোট গোলের হিসেবে ইংলিশ ফরোয়ার্ড হ্যারি কেইনের রেকর্ড ২৮ গোল এবং ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের ২৬ গোলের চেয়ে মেরিনো সংখ্যাগত দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, একজন রক্ষণাত্মক বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের জন্য ম্যাচের শেষ ভাগে এসে এতগুলো গোল করা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো বিশ্বমানের পরিসংখ্যান।
ম্যাচের ৮০ মিনিটের পর মেরিনোর করা এই ১২টি গোলের মধ্যে ৮টি গোলই সরাসরি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা দলকে নিশ্চিত পরাজয় থেকে সমতায় ফিরিয়েছে কিংবা এনে দিয়েছে মহামূল্যবান জয়। সর্বশেষ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মেরিনোর সেই চিরচেনা গোলক্ষুধা আবার প্রত্যক্ষ করেছে ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করার কার্যকারিতা বা হারের দিক থেকে হ্যারি কেইনের (৩৬%) চেয়ে মিকেল মেরিনো অনেক গুণ এগিয়ে রয়েছেন, তাঁর এই সাফল্যের শতকরা হার ৭৫%!
ক্লাব ফুটবলেও আর্সেনালের হয়ে গত সেপ্টেম্বরে নিউক্যাসলের বিপক্ষে গানার্সদের ২-১ ব্যবধানের জয় এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেস্টার সিটির বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে বড় ভূমিকা ছিল এই মিডফিল্ডারের। আর স্পেনের ফুটবলপ্রেমীদের মনে ২০২৪ সালের ইউরো কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের সেই মহাকাব্যিক মুহূর্তটি আজীবন গেঁথে থাকার কথা, যেখানে ম্যাচের ১১৯তম মিনিটে তাঁর করা দুর্দান্ত এক হেডার গোলেই স্বাগতিক জার্মানির বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে নাটকীয় জয় পেয়েছিল স্পেন।
শেষ মুহূর্তে মেরিনোর ভাগ্যনির্ধারক গোলসমূহ
| ম্যাচ ও সাল | গোলের সময় | ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল |
| রিয়াল সোসিয়েদাদ বনাম মায়োর্কা (২০২৪) | ৯৩ মিনিট | ২-১ (জয়) |
| স্পেন বনাম জার্মানি (ইউরো ২০২৪) | ১১৯ মিনিট | ২-১ (জয়) |
| আর্সেনাল বনাম লেস্টার সিটি (২০২৫) | ৮৭ মিনিট | ২-০ (জয়) |
| স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডস (২০২৫) | ৯৩... মিনিট | ২-২ (সমতা) |
| আর্সেনাল বনাম নিউক্যাসল (২০২৫) | ৮৪ মিনিট | ২-০ (জয়) |
| আর্সেনাল বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (২০২৬) | ৮৪ মিনিট | ২-৩ (পরাজয়) |
| স্পেন বনাম পর্তুগাল (২০২৬ বিশ্বকাপ) | ৯১ মিনিট | ১-০ (জয়) |
| স্পেন বনাম বেলজিয়াম (২০২৬ বিশ্বকাপ) | ৮৮ মিনিট | ২-১ (জয়) |
মিকেল মেরিনোর পেশাদার ক্যারিয়ারের মোট ৩৫টি গোলের মধ্যে ১২টি গোলই এসেছে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে। অর্থাৎ মেরিনো তাঁর ক্যারিয়ারের মোট গোলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৪.৩%) করেছেন ম্যাচের ৮০ মিনিটের পর। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০টি গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায় শেষ মুহূর্তে গোল করার এই হারের দিক থেকে তিনি বর্তমান ফুটবল বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছেন। আজ রাতে ফ্রান্সের বিপক্ষে হতে যাওয়া সেমিফাইনালের মেগা দ্বৈরথেও স্পেনের ডাগআউট থেকে ম্যাচ বদলে দিতে বড় তুরুপের তাস হতে পারেন এই ম্যাজিক ম্যান মিকেল মেরিনো।