২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টাইন ফুটবল যখন চরম অগোছালো, ছন্নছাড়া আর একরাশ হতাশায় নিমজ্জিত, তখন বড় বড় ও নামী কোচদের কেউই আলবিসেলেস্তেদের ‘তপ্ত হটসিটে’ বসার সাহস দেখাচ্ছিলেন না। সবাই যখন ডাগআউটের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে দৃশ্যপটে হাজির হন লিওনেল স্কালোনি। সেই অনভিজ্ঞ আর সাধারণ তকমা পাওয়া স্কালোনিই আজ নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তিনি আধুনিক ফুটবলের ‘সবচেয়ে সেরা’ ও সফলতম কোচ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
৪৮ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ডের অধীনেই ২০২২ সালে সাড়ে তিন দশকের আক্ষেপ ঘুচিয়ে কাতারে তৃতীয় বিশ্বশিরোপা ঘরে তুলেছিল লিওনেল মেসির দল। আর এবার, ২০২৬ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় স্কালোনির শিষ্যরা। আগামীকাল রোববার (১৯ জুলাই) দিবাগত রাত ১টায় নিউজার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে স্পেনের মুখোমুখি হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
ভিত্তোরিও পোজ্জোর ৪৪ বছরের প্রাচীন রেকর্ডে ভাগ বসানোর সুযোগ
ফুটবল বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র দুটি দেশ পরপর দুটি আসরে ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ বিশ্বকাপে টানা দুবার বিশ্বসেরা হয়েছিল ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে সাম্বার জাদু দেখিয়ে টানা দুবার ট্রফি জিতেছিল ব্রাজিল। তবে দল হিসেবে ব্রাজিল পরপর দুবার বিশ্বকাপ জিতলেও তাদের ডাগআউটে ছিলেন ভিন্ন দুজন কোচ—১৯৫৮ সালে ভিসেন্তে ফিওলা এবং ১৯৬২ সালে আইমোর মোরেরা।
ইতিহাসে পরপর দুই বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে শিরোপা জেতার বিশ্বরেকর্ডটি কেবল একজনেরই দখলে রয়েছে। তিনি হলেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি কৌশলবিদ ভিত্তোরিও পোজ্জো, যাঁর অধীনে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইতালি। গত ৪৪ বছর ধরে এই রেকর্ডটি অক্ষুণ্ন রয়েছে। রোববার রাতে যদি আর্জেন্টিনা স্পেনকে হারাতে পারে, তবে ভিত্তোরিও পোজ্জোর পর ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং আধুনিক ফুটবলের প্রথম কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতার অনন্য ও অমর কীর্তি গড়বেন লিওনেল স্কালোনি।
যদি আর্জেন্টিনা হারে, তবুও এলিট লিস্টে স্কালোনি
এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি বিশ্বকাপের আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন ২১ জন ভিন্ন ভিন্ন কোচ। তবে এর মধ্যে মাত্র ৫ জন কোচ নিজেদের ক্যারিয়ারে একবার করে চ্যাম্পিয়ন ও একবার করে রানার্সআপ হওয়ার ‘এলিট লিস্টে’ জায়গা পেয়েছেন। রোববারের মেগা ফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি কোনো কারণে হেরেও যায়, তবুও ফুটবল ইতিহাসের সেই ৫ জনের অভিজাত তালিকায় ঢুকে যাবেন স্কালোনি। আর যদি জিতে যান, তবে তো অনন্য ইতিহাসই তৈরি হবে।
একবার করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ হওয়া সেই ৫ কিংবদন্তি কোচ:
হেলমুট শ্যুন (জার্মানি): ১৯৭৪ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৬৬ সালে রানার্সআপ।
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার (জার্মানি): ১৯৯০ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৮৬ সালে রানার্সআপ।
কার্লোস সালভাদোর বিলার্দো (আর্জেন্টিনা): ১৯৮৬ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৯০ সালে রানার্সআপ।
মারিও জাগালো (ব্রাজিল): ১৯৭৭০ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৯৮ সালে রানার্সআপ।
দিদিয়ের দেশম (ফ্রান্স): ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালে রানার্সআপ।
ফাইনালের আবহ ও ডাগআউটের লড়াই
বিশ্বকাপের আরেকটি অলিখিত নিয়ম এবারও অক্ষুণ্ন থাকছে; তা হলো—এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি কোচ নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। এবারের ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না, কারণ আর্জেন্টিনার ডাগআউটে থাকছেন খাঁটি আর্জেন্টাইন লিওনেল স্কালোনি এবং স্পেনের ডাগআউট সামলাবেন তাদের স্বদেশি কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
বিশ্বকাপে কোচদের অন্য সব রেকর্ডের মধ্যে ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পাঁচটি ভিন্ন দেশকে ৬টি আলাদা বিশ্বকাপে পরিচালনা করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। তবে স্কালোনি যেভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে আর্জেন্টিনাকে তুলে এনে একের পর এক কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলছেন, তাতে রোববারের ফাইনালটি তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অমরত্ব এনে দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।