২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাকাব্যিক ফাইনালের মহাদ্বৈরথ শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। তবে মাঠের সেই কাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে বসেছিল বিশ্ব ক্রীড়া ও বিনোদন জগতের এক অনন্য চাঁদের হাট। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা ফাইনালের উত্তাপকে সমর্থকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আয়োজন করেছিল এক জমকালো বিশেষ অনুষ্ঠান, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্যানাটিক ফেস্ট’। মেগা ফাইনালের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেনের কোচ এবং তারকা ফুটবলারদের এক নজর দেখার জন্য দুপুর থেকেই অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার উন্মাদের মতো ভালোবাসার সমর্থক। প্রিয় তারকাদের একটু কাছ থেকে দেখার জন্য পাঁচ-ছয় ঘণ্টাও লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন দুই শিবিরের ভক্তরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল ড্র অনুষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনা করা ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক রিও ফার্দিনান্দ ছিলেন ফিফার এই জমকালো আয়োজনের মূল সঞ্চালক। তিনি মঞ্চে আসার পর পুরো হলজুড়ে করতালির জোয়ার বয়ে যায়। এরপর ফার্দিনান্দের আমন্ত্রণে একে একে মঞ্চে আসেন স্পেনের মাস্টারমাইন্ড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং দলটির অধিনায়ক রদ্রি। মঞ্চের এক পাশে স্প্যানিশদের জন্য রাখা হয়েছিল দুটি চেয়ার। আর ঠিক মাঝখানে জ্বলজ্বল করছিল বিশ্ব ফুটবলের পরম আরাধ্য সেই সোনালি ট্রফি। ট্রফির অন্য পাশে পাতা ছিল তিনটি চেয়ার, যেখানে একে একে আসন গ্রহণ করেন আর্জেন্টিনার জাদুকরী অধিনায়ক লিওনেল মেসি, দলের সফল কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং বিশ্বস্ত গোলরক্ষক এমিলিয়েনো মার্টিনেজ।
পরিচয় পর্বের পরেই অনুষ্ঠানটি এক ভিন্ন মাত্রা পায়, যখন মঞ্চে উপস্থিত হন টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা পরাশক্তি নোভাক জোকোভিচ। সার্বিয়ান এই কিংবদন্তি ইংরেজি ও স্প্যানিশ—উভয় ভাষায় সাবলীলভাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন দুই দলের অধিনায়কের দিকে। জোকোভিচ এবং ফার্দিনান্দের এই যুগলবন্দির মাঝেই মঞ্চ আলো করে আসেন মার্কিন বাস্কেটবলের জনপ্রিয় ধ্রুবতারা কেভিন ডুরান্ট এবং আমেরিকান ফুটবল বা মেজর সকার লিগের জীবন্ত কিংবদন্তি টম ব্র্যাডি। ক্রীড়াঙ্গনের এই মহাতারকাদের পাশাপাশি হলিউডের তুমুল জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও অভিনেতা কেভিন হার্ট তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতায় পুরো অনুষ্ঠানটিকে আনন্দে জমিয়ে তোলেন।
আগামী পরশু দিন নিউইয়র্কের মাঠেই বিশ্বসেরা হওয়ার চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামবে এই দুই দল। এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দুই দলের কোচ এবং অধিনায়কেরা নিজেদের রণকৌশল নিয়ে খুব বেশি মুখ না খুললেও তাদের চোখজোড়া যে ট্রফির দিকেই নিবদ্ধ, তা স্পষ্ট বোঝা গেছে। তবে ম্যাচের সমস্ত স্নায়ুচাপকে দূরে ঠেলে দিয়ে ট্রফির দুই পাশে দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদের এই মেলবন্ধন এবং সমর্থকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করাই ছিল ফিফার এই বর্ণিল আয়োজনের মূল লক্ষ্য। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও লুইস দে লা ফুয়েন্তে ব্যক্তিগত জীবনে গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত। মঞ্চে উঠে তারা অত্যন্ত উষ্ণভাবে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করেন। একইভাবে আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসিও হেসেই হাত মেলান স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রির সঙ্গে। ফুটবল বিশ্বে এমন সুন্দর ও অভাবনীয় মুহূর্ত সচরাচর দেখা যায় না। তাই এই বিরল সুযোগকে এক ফ্রেমে বন্দি করতে সঞ্চালক ফার্দিনান্দ সবাইকে নিয়ে একটি সেলফি তোলার আহ্বান জানান। সামনে সোনালি ট্রফি এবং পেছনে দুই দেশের উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের রেখে এক ঐতিহাসিক সেলফিতে বন্দি হন বিশ্বখ্যাত এই তারকারা।
অনুষ্ঠানের নাম যেহেতু ‘ফ্যানাটিক ফেস্ট’, তাই পুরো আয়োজনজুড়ে দুই প্রান্তের গ্যালারি থেকে ভেসে আসছিল সমর্থকদের মুহুর্মুহু স্লোগান ও তুমুল করতালি। অনুষ্ঠানে স্পেন ও আর্জেন্টিনার সমানসংখ্যক সমর্থক উপস্থিত ছিলেন, আর মাঝের অংশে আসন ছিল সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের। তবে প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে এই বিশেষ অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের কোনো প্রশ্ন করার সরাসরি সুযোগ ছিল না; আয়োজকেরা সঞ্চালকের মাধ্যমেই ফুটবলপ্রেমীদের কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করেছেন। সাধারণত ফাইনালের ঠিক আগের দিন অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে এবার ফিফা দুই দিন আগেই সেই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ফেলেছে। ফাইনালের ঠিক আগে কোটি ভক্তকে সম্পৃক্ত করে এমন তারকাবহুল বিনোদনমূলক আয়োজন সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবল ইতিহাসে দেখা যায়নি। সেই দিক থেকে ফিফার এই নিউইয়র্কের আয়োজনটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং ফুটবল রোমাঞ্চের এক চমৎকার মেলবন্ধন।