২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনার তদন্তে এ পর্যন্ত ৬১ জনের মৃত্যুর অকাট্য তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং বাকি ৩ জনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এর আগে সকালে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই হত্যাযজ্ঞের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশন টিমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, "আমাদের খসড়া তালিকায় মোট ৬১ জনের মৃত্যুর অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। যার মধ্যে ৫৮ জনের নাম-পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। বাকিদের বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিতে কাজ চলছে।" হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "তদন্ত রিপোর্টের খসড়া নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য—এই বর্বরোচিত ঘটনার পেছনে থাকা প্রকৃত অপরাধীদের কেউ যেন কোনোভাবে পার পেয়ে না যায় এবং একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। আশা করছি, আগামী ২১ জুলাই নির্ধারিত সময়েই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই ঘটনার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা সম্ভব হবে।"
তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে হেফাজতে ইসলামের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল। এই প্রতিনিধি দলে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদ, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক এবং মুফতি হারুন ইজহারসহ অন্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, "আমরা আন্দোলনের শুরু থেকেই দাবি করে আসছি যে, শাপলা চত্বরের নির্মম ট্র্যাজেডিতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি এবং বহু তথ্য এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে শাপলার বীর শহীদদের লাশ গুম করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। ফলে বহু নিহতের নাম এই প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে আমাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে যে ৬১ জনের সুনির্দিষ্ট ও সংরক্ষিত তথ্য ছিল, তদন্ত প্রতিবেদনে মূলত তাদের নামই উঠে এসেছে।"
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, বহুল আলোচিত এই হত্যাযজ্ঞের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ মোট ৪১ জনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমের অপব্যবহার ও উসকানির অভিযোগে আসামির তালিকায় রাখা হয়েছে একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, বেসরকারি টেলিভিশনটির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীরকে। একই সঙ্গে গণহত্যার নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে তৎকালীন পুলিশ প্রধান (আইজিপি), র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও এই মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।