চলতি বিশ্বকাপে একের পর এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত উপভোগ করেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। অবশেষে ইউরোপসেরা স্পেন ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মধ্যকার ব্লকবাস্টার ম্যাচ দিয়ে পর্দা নামছে এই মহোৎসবের। মাঠের লড়াইয়ে কোটি ভক্তের চোখ স্বাভাবিকভাবেই আটকে থাকবে স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল ও আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসির ওপর। তবে ফ্রন্টলাইনের এই আকর্ষণের বাইরেও মেগা ফাইনালের আসল ভাগ্য গড়ে দিতে পারে অন্য এক অদৃশ্য লড়াই—গোলপোস্টের নিচে স্পেনের উনাই সিমন ও আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের মহাদ্বৈরথ।
উনাই সিমনের পারফরম্যান্স ও গোল্ডেন গ্লাভসের হাতছানি
এবারের টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই নিজের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কেড়েছেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। আজ রাতে স্পেন যদি শেষ হাসি হাসতে পারে, তবে এই আসরের সেরা গোলকিপার হিসেবে তার হাতে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ ওঠা প্রায় নিশ্চিত। পুরো আসরজুড়েই স্পেনের রক্ষণভাগ ছিল এককথায় দুর্ভেদ্য। নকআউটের কঠিন সমীকরণে কেবল শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা একমাত্র গোলটি হজম করেছে।
ফুটবল পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট সোফাস্কোর পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে সিমনকে ৭.০৪ রেটিং দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৭.১, সৌদি আরবের বিপক্ষে ৭.২ এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে তার রেটিং ছিল ৭.৪। এরপর নকআউটের অগ্নিপরীক্ষায় অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৬.৯, পর্তুগালের বিপক্ষে ৭.৫, বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৬.২ এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার রেটিং ছিল ৭.০।
সিমন এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে ১০টি চমৎকার সেভ করেছেন। গ্রুপ পর্বে অবিশ্বাস্য নিরেট রক্ষণের পর নকআউটের প্রতি ম্যাচে তিনি নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। পর্তুগাল ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের একাধিক নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা একাই নস্যাৎ করে দিয়েছেন। স্পেনের আক্রমণভাগের কেউ হয়তো ফাইনালে দৃশ্যমান নায়ক হবেন, কিন্তু শিরোপা জয়ের নেপথ্য নায়ক হিসেবে হাজির হতে পারেন কেবল সিমনই।
এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পারফরম্যান্স ও সতর্কবার্তা
আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নিচে আলবিসেলেস্তেদের প্রধান আস্থার প্রতীক হিসেবে শুরু থেকেই ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। টুর্নামেন্টের সাত ম্যাচের সবগুলোতে লিওনেল স্কালোনির মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি। তবে সোফাস্কোর-এর পারফরম্যান্স রেটিংয়ের খতিয়ানে সিমনের চেয়ে বেশ পিছিয়ে আছেন মার্টিনেজ—তার সামগ্রিক রেটিং ৬.৬৬।
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার রেটিং ছিল ৬.৬, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৬.৮ ও জর্ডানের বিপক্ষে ৬.৬। এরপর হাইভোল্টেজ নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে 📋 ৬.৭, মিশরের বিপক্ষে ৬.০, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭.২ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স রেটিং ছিল Injury-time ৬.৭। গ্রুপ পর্বে আলবিসেলেস্তেদের শক্তিশালী ডিফেন্সের কারণে খুব একটা পরীক্ষায় পড়তে হয়নি মার্টিনেজকে, ফাইনালে ওঠার পথে তিনি মোট ৯টি সেভ করেছেন।
তবে গ্রুপ পর্বে কেবল জর্ডানের কাছে ১টি গোল খেলেও নকআউটের কঠিন ম্যাচগুলোতে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি মার্টিনেজ। নকআউট পর্বে সব মিলিয়ে ছয়বার গোল হজম করতে হয়েছে এই আর্জেন্টাইন কিপারকে। এমনকি তার কিছু অসতর্কতায় আলবিসেলেস্তেরা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যেতে যেতেও অবিশ্বাস্যভাবে টিকে গেছে। ফাইনালে মার্টিনেজকে পরাস্ত করতে শুরু থেকেই ব্যতিব্যস্ত থাকবে স্পেনের ক্ষুরধার আক্রমণভাগ। তাই এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে ‘বাজপাখি’ মার্টিনেজ সর্বোচ্চ সতর্ক না থাকলে আর্জেন্টিনার কপালে বড় বিপদ ঘটতে পারে।
বিশ্বমঞ্চের ফাইনালের ফল নির্ধারণে কার ভূমিকা বড়?
মেগা ফাইনালে শিরোপার ভাগ্য নির্ধারণে মেসি ও ইয়ামাল হয়তো ফ্রন্টলাইনে থেকে বড় ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু নিজ নিজ দেশের হয়ে প্রতিপক্ষের গোল করার সব প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে দলের জয়ে সমান অবদান রাখতে হবে সিমন ও মার্টিনেজকেও।
মাঠের লড়াইয়ের সমীকরণ বলছে, এই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের রক্ষণভাগই যে টুর্নামেন্টের সেরা, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা এই আসরে মোট সাতটি গোল হজম করলেও ডিফেন্সের ভুল শুধরে তাদের অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর অতীত অভিজ্ঞতা ফাইনালে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখবে। তবে স্পেনের গতিময় আক্রমণভাগকে রুখতে হলে নিজের চেনা ছন্দের সেরা পারফরম্যান্সই দেখাতে হবে মার্টিনেজকে।
স্পেন নিজেদের ডিফেন্সে কঠোর শৃঙ্খলা ধরে রেখে পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা আক্রমণভাগ নিয়ে তাদের গভীর দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। এজন্য স্প্যানিশ ডিফেন্সের ফাঁক গলে বল চলে এলে উনাই সিমনকে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। মোদ্দাকথা, ২০২৬ বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠত্বের ফল নির্ধারণে দুই গোলকিপারই হতে চলেছেন ম্যাচের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড।