সংবাদ সম্মেলন কক্ষ জুড়ে তখন এক গুমোট নীরবতা। চোখের কোণে জমা জল আর অবরুদ্ধ কণ্ঠ লুকাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। যে মানুষটি একাদশে বড় কোনো তারকা ছাড়াই এক ভগ্নপ্রায় আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে বিশ্বজয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় বসিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের অশ্রুসিক্ত রাতে সেই মহাগুরুর কণ্ঠে যেন বেজে উঠল বিদায়ের করুণ সুর। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এএফএ-র সাথে চুক্তি শেষ হওয়ার ঠিক পাঁচ মাস আগে স্পেনের বিপক্ষে এই হৃদয়বিদারক হারের পর কি তবে শেষ হতে চলেছে আলবিসেলেস্তে ফুটবলের সবচেয়ে স্বর্ণালী ও রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়?
বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে স্পেনের কাছে শিরোপা হারানোর পর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ। আগামী ডিসেম্বরেই তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া স্কালোনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ঘোর অনিশ্চয়তার আভাস দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে কান্না চাপতে না পেরে আর্জেন্টাইন এই মাস্টারমাইন্ড জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ দিকে চলে এলেও দলের দায়িত্বে আর থাকবেন কি না, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাতে পারেননি।
আবেগে আপ্লুত কণ্ঠে স্কালোনি শুরুতেই বলেন, ‘আমি লিওনেল মেসির সঙ্গে এখনও এই বিষয়ে কথা বলিনি। আর আমার কথা যদি বলি, তবে আমি খুব দ্রুতই সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার সঙ্গে একান্তে বসব। আমার মাথায় একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তির বাকি সময়টুকু আমি নিয়মতান্ত্রিকভাবে শেষ করব, তারপর ভবিষ্যৎ দেখা যাবে। তবে সত্যি বলতে, আমার একটু গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, এত বড় কোনো অর্জন বা সাফল্য ভবিষ্যতে আর টেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব কি না, তা আমার জানা নেই। হয়তো আমাদের এখন সব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন আছে। এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় আমাকে নিয়ে আসার জন্য আর এত বড় সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।’ এটুকু বলার পরেই কান্নায় রুদ্ধ হয়ে যায় তার কণ্ঠ।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে স্কালোনি আরও যোগ করেন, ‘যে রাজকীয় জায়গায় আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি, তা ফুটবলবিশ্বের যে কারও জন্যই এক আজন্ম স্বপ্নের নাম। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে মাঠের ফুটবলার—সবাই আমরা একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের সবটুকু নিংড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাই এখন কিছুটা সময় নিয়ে নতুন করে ভবিষ্যৎ চিন্তা করাটা মোটেও ভুল কিছু নয়। এই জায়গাটা চমৎকার, জীবনের এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নপূরণ, যা আমি কোনো দিন সাধারণ চোখে কল্পনাও করিনি।’
আবেগের প্রবল জোয়ারের মাঝেও আবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেন স্কালোনি। এর পরেই প্রকাশ পায় আর্জেন্টিনা দলের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন নিয়ে তার ভেতরের গভীর দুশ্চিন্তা ও সংশয়। তিনি বলেন, ‘আমি বা আমাদের কোচিং স্টাফের কেউ কখনো ভাবেনি যে আমরা আজকের এই সাফল্যের জায়গায় পৌঁছাব। তাই এভাবে পথচলা বজায় রাখতে গেলে অনেক কিছুর প্রয়োজন—বিশেষ করে পুরো বিষয়টাকে নতুন করে রিসেট করা আর দলটাকে সম্পূর্ণ নতুন করে পুনর্গঠন করা। এমন একটা দল আর কোনো দিন গড়ে তোলা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর এই নির্মম সত্যটাই আমাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই স্বর ভেঙে আসে তার, আর এর পরপরই হঠাৎ করে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে যান তিনি।
স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের জন্য এএফএ-র সঙ্গে আলোচনা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর হওয়ায় আলোচনা ইতিবাচক পথেই এগোচ্ছিল, তবে ফাইনালের পর স্কালোনির এমন ভেঙে পড়া ও মন্তব্যে পরিষ্কার—সব সিদ্ধান্তই এখন ঝুলে থাকছে বছর শেষের নির্ধারিত বৈঠকের ওপর। অবশ্য নিজের চুক্তির চেয়ে সবসময় দলকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন স্কালোনি। গত মে মাসে বিদেশি গণমাধ্যম রেডিও লা রেড-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন যে, তার কাছে প্রধান কাজ হলো বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবা। যেহেতু ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময় আছে, তাই চুক্তি নিয়ে তড়িঘড়ি করার কিছু নেই। এএফএ-র কাছেও এটা কোনো জরুরি ইস্যু নয়। তবে মেটলাইফের হার সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিল।