বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে যখন উদযাপনে মত্ত স্প্যানিশ তরুণরা, তখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর কাড়ছিলেন এক ১৯ বছরের কিশোর। বিশ্বজয়ের মহারণে প্রথমবার পা রেখেই নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেললেন স্পেন ও বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরার পর এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের আলোচনার প্রধান তুঙ্গে উঠে এসেছে বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেওয়া ইয়ামালের সেই বহুল আলোচিত ও বেশ রসাত্মক এক অঙ্গীকার!
বিশ্বকাপের দামামা বাজার ঠিক আগমুহূর্তে নিজের ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে ভক্তদের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল। সমর্থকদের অনুপ্রাণিত করতে এবং বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের ভেতরের প্রবল আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে সেই ভিডিওতে স্প্যানিশ এই ওয়ান্ডারকিড বলেছিলেন, ‘আমি আজ সবাইকে কথা দিচ্ছি, আমরা যদি বিশ্বকাপের ফাইনাল জিতে ট্রফি ঘরে তুলতে পারি, তবে টানা তিন সপ্তাহ আমি আমার দাড়ি ও গোঁফ একদম শেভ করব না। আর এর পাশাপাশি আমার সমর্থকদের মধ্যে থেকে ১০০ জনকে বিশেষ বিটস ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম হেডফোন উপহার হিসেবে দেব।’ বিশ্বফুটবলের নতুন রাজা হওয়ার পর তরুণ এই তুখোড় ফরোয়ার্ড কি তার দেওয়া কথা অক্ষরে অক্ষরে রাখবেন? নাকি বিশ্বজয়ের আনন্দেই উবে যাবে সেই প্রতিশ্রুতি? ক্রীড়াবিশ্ব এখন সেটি দেখার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে স্প্যানিশ কোচিং স্টাফের আস্থার প্রতীক হিসেবে শুরুর একাদশে প্রায় নিয়মিত মুখ ছিলেন ইয়ামাল। কেবল কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে তাকে বিকল্প বা বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামানো হয়েছিল। টুর্নামেন্টের শুরুতে সাম্প্রতিক ইনজুরি ও চোট কাটিয়ে ওঠায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নিজের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রূপ ধারণ করেন তিনি। পুরো আসরেই প্রতিপক্ষ দলের রক্ষণভাগের ফুটবলারদের প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিলেন এই তরুণ ড্রিবলার।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল ম্যাচে ১-০ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ে তিনি অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আর কেবল ট্রফি জয়ই নয়, ফাইনালের এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে মাঠে নেমে একাধিক বিশ্বরেকর্ড নিজের ঝুলিতে পুরেছেন স্প্যানিশ এই ফরোয়ার্ড।
পরিসংখ্যানের খাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ইয়ামাল। এর মাধ্যমে ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে যৌথভাবে চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। অন্যদিকে, তার তরুণ সতীর্থ পাউ কুবারসি ১৯ বছর ১৭৮ দিন বয়সে এই গৌরব অর্জন করে তালিকার সপ্তম সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারে পরিণত হয়েছেন।
এর বাইরেও বিশ্বফুটবলের রাজপুত্র পেলের এক অনন্য রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন ইয়ামাল। ১৯৫৮ সালে বিশ্বফুটবলের কিংবদন্তি পেলে মাত্র ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার বিরল ইতিহাস গড়েছিলেন। পেলের সেই অবিশ্বাস্য কীর্তির পর ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামা ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম নথিভুক্ত করলেন ইয়ামাল।
তবে রেকর্ড বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সম্পূর্ণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে ইয়ামালই প্রথম এবং একমাত্র টিনএজার বা কিশোর ফুটবলার, যিনি একই সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর ‘ইউরো’ এবং ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফিফা বিশ্বকাপ’—এই দুটি মেগা টুর্নামেন্টেরই শিরোপা জয়ের অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন নজির স্থাপন করেছেন। এর আগে আর কোনো তরুণ খেলোয়াড় এত কম বয়সে ইউরোপ ও বিশ্বের সেরা দুটি শিরোপা একসঙ্গে নিজের ট্রফি কেসে তুলতে পারেননি।
বিশ্ব ফুটবলের নতুন সেনসেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইয়ামাল মাঠের পারফরম্যান্সে ইতিমধ্যেই নিজেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রতিভাবানদের কাতারে নিয়ে গেছেন। তবে বিশ্বমুকুট জয়ের পর এখন ক্রিকেট ও ফুটবল ভক্তদের নজর শুধুই ইয়ামালের পরবর্তী অবয়বের দিকে—আসলেই কি তাকে আগামী তিন সপ্তাহ না কামানো দাড়ির ভিন্ন চেহারায় দেখতে পাবে ফুটবল বিশ্ব? নাকি ১০০টি ব্র্যান্ডেড হেডফোন উপহার দিয়ে ভক্তদের মন জয় করার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণেই বেশি ব্যস্ত থাকবেন স্পেনের এই রাজপুত্র? উত্তর মিলবে খুব জলদি।