রেফারির অন্তিম বাঁশি বাজার পর মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা লিওনেল মেসি। গাঢ় চোখ দুটি মেলে অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন গ্যালারিতে সমবেত হাজারো আর্জেন্টিনার নীল-সাদা সমর্থকদের দিকে। পরাজয়ের তীব্র নীল বেদনা বুকে চেপেও পুরো স্টেডিয়াম তখন সমস্বরে ডেকে চলেছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই জাদুকরের নাম।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বিশ্বফুটবল প্রত্যক্ষ করল শতাব্দীর অন্যতম আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য। উল্লাস ছেড়ে স্পেনের ১৯ বছর বয়সী তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল সোজা হেঁটে এলেন স্প্যানিশ ভাষার জাদুকর মেসির দিকে। বুকে টেনে নিলেন প্রবীণ মহাতারকাকে। ওই একটি নিবিড় আলিঙ্গন যেন স্রেফ বিজয়ী ও বিজিতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না; তা ছিল ফুটবলের রাজকীয় মশাল এক হাত থেকে আরেক বিশ্বস্ত হাতে তুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী ‘১০ নম্বর’ জার্সির সর্বকালের সেরা সাবেক মালিককে পরম শ্রদ্ধায় বুকে চেপে ধরলেন ক্লাবটির বর্তমান ‘১০ নম্বর’ জার্সির তরুণ কাণ্ডারি ইয়ামাল। বৈশ্বিক ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই রূপকটি এক অভাবনীয় রূপ ধারণ করেছে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক স্মরনীয় ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে এই দৃশ্য। একটি দাতব্য সংস্থার ক্যালেন্ডার র্যাফেলের প্রচারণায় তৎকালীন ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি পরম যত্নে মাত্র ৬ মাস বয়সী একটি শিশুকে প্লাস্টিকের টবে স্নান করিয়েছিলেন।
২০২৬ সালের এই ফাইনাল ম্যাচের আগে সেই পুরোনো আলোকচিত্রটি বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন তৈরি করে। ২০০৭ সালের সেই ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুটিই আজকের ১৯ বছরের বিশ্বজয়ী ফুটবল তারকা লামিনে ইয়ামাল! আর অন্যদিকে, মহাকাব্যিক ক্যারিয়ারের একেবারে অন্তিমলগ্নে দাঁড়িয়ে নিজের শেষ বিশ্বকাপ ট্রফির দৌড় শেষ করলেন ৩৯ বছরের মেসি।
আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির চেয়ে দীর্ঘ দুই দশকের ছোট ইয়ামাল ক্যারিয়ারের একেবারেই শুরুর সূচনায় দাঁড়িয়ে আছেন। মাত্র দুই বছর আগে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে বিশ্বমঞ্চে ধুমকেতুর মতো আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। আর এবার মহাদেশীয় সীমানা ছাড়িয়ে ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি শিরোপা উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সংক্ষিপ্ত সময়েই সমস্ত বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন স্প্যানিশ এই ওয়ান্ডারকিড।
ম্যাচের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আবেগাপ্লুত ইয়ামালকে মাঠে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুবর্ণ সময় কাটাতে দেখা যায়। বিশেষ করে নিজের তিন বছর বয়সী ছোট ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার চমৎকার দৃশ্যটি লাখো সমর্থকের মন জয় করে নেয়। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারিতে তার এই অনুজ ভাইয়ের সরব উপস্থিতি দর্শকমহলে বেশ কৌতূহল ও আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিল।
শিরোপানির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে আর্জেন্টিনা দল যখন অশ্রুসজল চোখে মাঠ ছাড়ছিল, ঠিক তখনই মহাতারকা মেসিকে শান্ত করার জন্য এগিয়ে যান ইয়ামাল। ২০০৭ সালের সেই অবোধ শিশুকে স্নান করানোর গল্প থেকে শুরু করে ২০২৬-এর এই ঐতিহাসিক মেগা ফাইনালে মহাতারকাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মহাকাব্যিক সমাপ্তি—ফুটবলের নন্দনকাননে ইতিহাস যে এভাবে নিজের বৃত্তপূরণ করে, তা আরেকবার প্রমাণ করে দিল মেসি-ইয়ামালের এই অবিনাশী মুহূর্তটি।