গ্রিক সভ্যতার প্রাচীন অলিম্পিক থেকে শুরু করে হিটলারের নাৎসি জার্মানি—বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতি বরাবরই যেন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে অবস্থান করে এসেছে। আন্তর্জাতিক খেলাধুলাকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত রাখার সার্বজনীন ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে তা কোনোকালেই পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি সমাপ্ত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবারও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও অভিবাসন নীতি এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কের গ্যাঁড়াকলে পড়ে টুর্নামেন্টজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের চরম রাজনৈতিক জটিলতার সাক্ষী হতে হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট অব আর্ট অ্যান্ড আইডিয়াস’ (আইএআই)-এ প্রকাশিত কূটনীতি বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে অ্যালেন পিগম্যানের এক গভীর বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের এই রাজনৈতিকীকরণের নানাদিক উঠে এসেছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক ও বিশাল আয়োজনের দাবিদার এই বিশ্বকাপটি নানামুখী বিতর্ককে সঙ্গী করেই ইতি টেনেছে। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা ও রাজনৈতিক বাধার কারণে অনেক খেলোয়াড়, দলীয় কর্মকর্তা ও সাধারণ সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতেই পারেননি। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আপত্তিতে মার্কিন জাতীয় দলের বিপক্ষে দেওয়া রেফারির একটি সিদ্ধান্ত ফিফা সভাপতির হস্তক্ষেপে বাতিল করার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন মূলত কার স্বার্থ রক্ষা করে এবং এটি বৈশ্বিক বিনোদনের আড়ালে শুধুই কি অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জনের এক করপোরেট হাতিয়ার, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা সুযোগ বুঝে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন—এমন মৌলিক প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়েছে।
ন্যায্য প্রতিযোগিতা বা ‘ফেয়ার প্লে’ খেলার মূল ভিত্তি হলেও প্রাচীনকাল থেকেই খেলাধুলাকে রাজনৈতিক কূটনীতির অস্ত্র বানানোর নজির রয়েছে। প্রাচীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘একেখেইরিয়া’ বা অলিম্পিক যুদ্ধবিরতির নিয়ম চালু ছিল, যা মূলত এক ধরনের কূটনৈতিক আলোচনার দুয়ার খোলা রাখত। কূটনীতি বিশেষজ্ঞ জেমস ডের দেরিয়ানের ভাষ্যমতে, রাজনীতিতে কূটনীতির প্রধান কাজ সরকার ও জনগণের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা দূর করা। বর্তমান গণমাধ্যমের যুগে এটিকে জনসম্পৃক্ত কূটনীতি বা পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিখাউ কোবিয়েরেৎস্কির মতে, ক্রীড়া কূটনীতি হলো এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে শত কোটি বৈশ্বিক দর্শক সরাসরি যুক্ত থাকেন। কূটনীতি গবেষক স্টুয়ার্ট মারে এবং জিওফ্রে অ্যালেন পিগম্যান ক্রীড়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এবং খেলাকেই কূটনীতি হিসেবে চালনা করার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। এছাড়া এইচ ই চেহাবি এটিকে 'জনগণের সঙ্গে জনগণের কূটনীতি' হিসেবে আখ্যা দেন, যেখানে সরকারি প্রভাবের বাইরে গিয়ে ভক্তদের আন্তঃসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তবে ইতিবাচক কূটনীতির আড়ালে সরকারগুলো প্রায়শই রাষ্ট্রীয় প্রচার-প্রচারণা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর কৌশল গ্রহণ করে। ইদানীংকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নেতিবাচক চিত্র আড়াল করতে ক্রীড়াকে ব্যবহার করাকে বলা হচ্ছে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। অন্যদিকে স্টুয়ার্ট মারে তাঁর গবেষণায় ‘স্পোর্টস অ্যান্টি-ডিপ্লোম্যাসি’র কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক খেলাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বৈরিতা ছড়াতে ব্যবহার করে—যেমনটি ১৯ ৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে হিটলার করেছিলেন কিংবা ১৯৬৯ সালে এল সালভাদর ও হন্ডুরাসের মধ্যে ঘটা ‘ফুটবল যুদ্ধ’।
ফিফা তাদের নীতিমালায় রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আয়োজক দেশে সকলের অবাধ প্রবেশের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর ফিফার নীতিমালার সঙ্গে মার্কিন অভিবাসন নীতির সরাসরি সংঘাত দেখা দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ২০ থেকে ৪০টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করে এবং অভিবাসন পুলিশের (আইসিই) মাধ্যমে গণ-আটকের অভিযান পরিচালনা করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর্থিক দিক বিবেচনা করে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখতে ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে বিশেষ ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করেন। ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশনায় ইরানে সামরিক হামলার ঘটনায় ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের অনুশীলন মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংকট চরম আকার ধারণ করে।
বাস্তবে দেখা যায় ফিফার কোনো নীতিই ট্রাম্প প্রশাসন মানেনি। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে ভিসা দেওয়া হয়নি, আর ইরান দলকে মাত্র ১০ দিন আগে শর্তসাপেক্ষে প্রবেশাধিকার দিয়ে অ্যারিজোনার বদলে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় থাকতে বাধ্য করা হয়। ইরাক ও সুইজারল্যান্ডের ফুটবলারদের সীমান্তে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হয় এবং একাধিক দেশের সংবাদকর্মী ও দর্শকদের ভিসা প্রত্যাখান করা হয়। ফিফায় পুঁজিবাদের বিপুল মুনাফার চাপ থাকায় তারা এ বিষয়ে নীরব ছিল। ২০২৩-২৬ চক্রে ফিফার মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে কেবল বিশ্বকাপ থেকেই এসেছে ৮৯০ কোটি ডলার। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, এই আসর বৈশ্বিক জিডিপিতে ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি অবদান রেখেছে, যা এই আয়োজনকে স্রেফ ব্যবসায়িক রূপ দিয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের স্পোর্টস অ্যান্টি-ডিপ্লোম্যাসি তাণ্ডবের মধ্যেও সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য রক্ষা করে 'জনগণের কূটনীতি' সফল করেছেন। বোস্টনের বাসিন্দাদের সঙ্গে স্কটল্যান্ডের ‘টারটান আর্মি’ সমর্থকদের বন্ধুত্ব বা বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের ওয়াচ পার্টি ও খোলা মাঠে আড্ডা ফুটবলের আসল সৌন্দর্যকে বজায় রেখেছে। তাসত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থক বায়রন পিলে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাজনৈতিক বৈরিতা মাঠের সৌন্দর্যকে ঢেকে ফেলে। সামনের ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের আগে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) উচিত ২০২৬ বিশ্বকাপের রাজনৈতিক শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্পষ্ট শর্ত আরোপ করা, যাতে ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকের মতো তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত না হয়।