ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ডেলিভারিম্যান


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৪:২০ পিএম

কাজের ফাঁকে ফাঁকে রাস্তার ধারে কিংবা অবসরে কাগজের টুকরোয় মনের ভাব লিখে রাখা সাধারণ এক খাবার সরবরাহকারীর হাত ধরেই এল চীনের অন্যতম সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান। সারাদিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি ভুলে কলম তুলে নেওয়া সেই ফুড ডেলিভারিম্যানের লেখনীই আজ চীনের জাতীয় পর্যায়ের সাহিত্য অঙ্গনে তৈরি করেছে এক নতুন ইতিহাস।

এমনই এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিং, যিনি অর্জন করেছেন সম্মানজনক ‘লু শুন সাহিত্য পুরস্কার’। মূলত তাঁর রচিত প্রশংসিত কবিতা সংকলন ‘লো ফ্লাইট’-এর স্বীকৃতি হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আধুনিক চীনা সাহিত্যের প্রথীতযশা জনক লু শুনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রবর্তিত এই পুরস্কারকে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ ও মানসম্মত সাহিত্য স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

তবে ওয়াং জিবিংয়ের এই অনন্য সফলতার পেছনের জীবন সংগ্রাম মোটেই সহজ ও মসৃণ ছিল না। চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্মগ্রহণ করা এই কবি অত্যন্ত কম বয়সে পরিবারের তীব্র আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হয়ে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন। পেটের তাগিদে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি কখনো নির্মাণশ্রমিক, কখনো আবর্জনা সংগ্রাহক, আবার কখনো রাস্তার পাশে হকার হিসেবে দিনপাত করেছেন। নানা চড়াই-উৎরাই পার করে অবশেষে ২০১৯ সাল থেকে তিনি সরাসরি খাবার সরবরাহের পেশায় নিযুক্ত হন।

জীবিকার কঠিন বাস্তবতার কষাঘাত সত্ত্বেও ওয়াংয়ের সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ বিন্দুমাত্র কমেনি। গত এক দশক ধরে তিনি নিজের চিন্তাভাবনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কবিতা ও প্রবন্ধ আকারে নিয়মিত প্রকাশ করে আসছেন। তাঁর প্রতিটি পঙক্তিতে ফুটে ওঠে নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই, জমানো ক্লান্তি, রঙিন স্বপ্ন এবং অন্তরের না বলা গল্পসমূহ।

২০২২ সালে ওয়াংয়ের লেখা ‘ম্যান ইন আ হারি’ শীর্ষক কবিতাটি সাহিত্যপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তুমুল আলোচনার ঝড় তোলে। ভুল ঠিকানার দরুন দীর্ঘ সময় ধরে এক গ্রাহকের দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার যে তেতো ও কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছিল, সেই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় আলোচিত কবিতাটি।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশ করা তাঁর জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘লো ফ্লাইট’ মূলত প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি কর্মীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকারকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। কাব্যগ্রন্থটির বহুল পঠিত ও গভীর অর্থবহ একটি চরণ হলো— “কে বলে ডানা মেললেই উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।”

সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওয়াং জিবিং ব্যক্ত করেন, পুরস্কারের চূড়ান্ত বার্তাটি হাতে পাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমি মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। বর্তমানে সংবাদটি পাওয়ার পর মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। অবশ্য এমন বৈশ্বিক ও জাতীয় সম্মাননা সত্ত্বেও তাঁর সাধারণ জীবনযাপনে কোনো বড় রদবদল আসবে না বলে তিনি স্পষ্ট জানান।

নিজের বর্তমান জীবনধারা সম্পর্কে ওয়াং উল্লেখ করেন, জীবিকা সংস্থানের জন্য এই কাজ চালিয়ে যাওয়া এখন হয়তো অপরিহার্য নয়, তবে আমি এই কর্মক্ষেত্রের আবহ ও গতিময়তা দারুণভাবে উপভোগ করি। এই ব্যস্ততা আমাকে সবসময় সজীব ও উদ্যমী রাখে। ফলে সাধারণ ও প্রাত্যহিক জীবনের মধ্য দিয়েই আমি হেঁটে যেতে চাই।

সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষভাগে, অর্থাৎ ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে ‘লো ফ্লাইট’ বইটির ইংরেজি অনুবাদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হবে। ফলে ওয়াংয়ের এই হৃদয়গ্রাহী রচনা কেবল চীনের সীমানায় বন্দি না থেকে বিশ্বব্যাপী পাঠকদের দরবারে পৌঁছে যাবে।

ওয়াং জিবিংয়ের এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জন স্রেফ একজন ব্যক্তির সাফল্যের উপাখ্যান নয়; এটি স্পষ্ট করে দেয় যে সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা আভিজাত্যের একচ্ছত্র সম্পদ নয়। জীবনসংগ্রামের চরম প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা যেকোনো মানুষ কেবল নিজের মেধা ও কলমের শক্তিতে পৌঁছে যেতে পারেন সাফল্যের স্বর্ণশিখরে।

উল্লেখ্য, বর্তমান চীনে খেটে খাওয়া প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকে একের পর এক প্রতিভাবান সাহিত্যিকের উত্থান ঘটছে। সাবেক পার্সেল সরবরাহকারী হু আনিয়ান, খনিশ্রমিক চেন নিয়ানশি এবং কৃষক-কবি ইউ শিউহুয়ার মতো লেখকেরা ইতিপূর্বে সাহিত্য অঙ্গনে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তাদের সাহিত্যকর্মে সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনগাথা অনন্যভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। ওয়াং জিবিংয়ের এই অবিস্মরণীয় জয় আবার প্রমাণ করল— স্বপ্নের কোনো ধরাবাঁধা পেশা হয় না এবং সাহিত্য কখনো মানুষের সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে না।



এ সম্পর্কিত আরো খবর