সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 27
রেজাউল করিম ঝন্টু , সিরাজগঞ্জ
কম উৎপাদন খরচ, রোগবালাইয়ের কম ঝুঁকি, সহজ পরিচর্যা এবং বাজারে সারা বছর ব্যাপক চাহিদা থাকায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাণিজ্যিক আখ চাষ। চলতি মৌসুমে উপজেলায় আখের বাম্পার ফলন হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি। লাভজনক হওয়ায় অনেক চাষি প্রচলিত ধান, পাট বা অন্যান্য দানাদার ফসলের আবাদ কমিয়ে এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতে আখ চাষে ঝুঁকছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উল্লাপাড়ায় প্রায় ২৪ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে, যা কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ হেক্টর বেশি। উপজেলার বাঙ্গালা, সলঙ্গা ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আখের ক্ষেত দেখা গেছে। দেশীয় জাতের পাশাপাশি প্রবাস ফেরত ও স্থানীয় কৃষকেরা উন্নত জাতের ‘ব্ল্যাক সুগার কেইন’, ঈশ্বরদী অঞ্চলের অনুমোদিত ই-১৬, ই-৪৫, ই-৪৬, ই-৪৭ এবং চিবিয়ে খাওয়ার সুস্বাদু ‘রং বিলাস’ জাতের আখ চাষ করে দারুণ সাফল্য পাচ্ছেন।
কৃষিবিদদের মতে, আখ অত্যন্ত লাভজনক একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থকরী ফসল। একবার চারা রোপণের পর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, সঠিক সেচ ও সময়মতো সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলেই কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায়। অন্যান্য ফসলের মতো বারবার জমি প্রস্তুত বা চারা রোপণের বাড়তি ঝামেলা না থাকায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম হয়।
বাঙ্গালা ইউনিয়নের শিমলাদহ গ্রামের চাষি সেলিম হোসেন জানান, বিগত কয়েক বছর ধরেই তিনি বাণিজ্যিকভাবে আখ চাষ করছেন। এবারের ফলন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘‘আখে রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হওয়ায় ঝুঁকির মাত্রা অনেক কম। বাজারে সব সময় ভালো দাম পাওয়া যায়। আমাদের সাফল্য দেখে এলাকার অনেক তরুণ ও কৃষক নতুন করে আখ চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।’’
সলঙ্গা ইউনিয়নের মানিকদিয়ার গ্রামের সফল আখচাষি মান্নান মিয়া জানান, জমি থেকেই পাইকাররা তাঁর আখের ক্ষেত কিনে নিচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে একেকটি আখ পাইকারি দরে ৮ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে নেওয়ার ঝামেলা ও পরিবহন খরচ বেঁচে যাওয়ায় মুনাফার পরিমাণও বেশি থাকছে।
একই এলাকার কৃষক মজিদ আলী আড়াই বিঘা জমিতে আখের আবাদ করেছেন। ইতোমধ্যে এক বিঘার আখ বিক্রি শেষ করে তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে গুণমানভেদে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। উন্নত জাতের রসালো আখ হলে বাজার দর আরও বেশি পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উল্লাপাড়ার উৎপাদিত আখ শুধু স্থানীয় চাহিদাই মেটাচ্ছে না; বরং সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, নাটোর ও টাঙ্গাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় সুস্বাদু এই আখ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় গুড় তৈরির কারখানা, শহরের আখের রস বিক্রেতা এবং ফলপট্টিগুলোতেও এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে তীব্র গরমে আখের রসের কদর বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও আখ একটি বেশ সহনশীল ফসল। সঠিক জাত নির্বাচন ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এর পাশাপাশি এলাকায় আখভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প ও প্রথাগত গুড় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমী বলেন, ‘‘অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখে উৎপাদন খরচ কম হলেও নিট লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। কৃষকেরা জমি থেকেই সরাসরি পাইকারদের কাছে আখ বিক্রি করে নগদ টাকা পাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে উন্নত জাতের চারা প্রদান, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আধুনিক রোগবালাই ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এতে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ভবিষ্যতে উন্নত জাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে উল্লাপাড়াকে বাণিজ্যিক আখ উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় মডেল অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।’’