ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস

ফুটপাত ও চাঁদার বিরোধে যুবদল নেতাকে হত্যার ছক, চার শুটারসহ গ্রেপ্তার ৬


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৭ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৯:৪৯ এএম

অনলাইন রিপোর্টার

রাজধানীর কাফরুলে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় চার পেশাদার শুটারসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ঘটনায় চার শুটারকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখা ও ব্যবহারের অপরাধে পৃথক আরেকটি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাটি ইতোমধ্যে অধিকতর তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং অস্ত্র মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে কাফরুল থানা পুলিশ।

এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এখন পর্যন্ত মোট ৬ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া সরাসরি শুটার চঞ্চল মোল্লা, জিহাদ, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ এবং তাদের দুই প্রধান সহযোগী নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান ও মো. শাফিন ছৈয়াল। এদের মধ্যে সরাসরি গুলিবর্ষণকারী শুটার চঞ্চল মোল্লাকে পুলিশের হেফাজতে এনে নিবিড় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা ও থানা পুলিশ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু ছিলেন কিলারদের মূল ও একমাত্র টার্গেট। কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান হাফিজের প্রত্যক্ষ নির্দেশে তাকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মাগুরা ও ঝিনাইদহ এলাকা থেকে চঞ্চল মোল্লা, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ এবং জিহাদ নামের চারজন দুর্ধর্ষ ও পেশাদার শুটারকে মোটা অঙ্কের চুক্তিতে ঢাকায় ভাড়া করে আনা হয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৩ জুলাই উক্ত চার শুটারকে কৌশলে ঢাকায় এনে মিরপুরের ‘হোটেল প্রাইম’-এর ৯ তলায় ৯০৩ নম্বর কক্ষে ওঠানো হয়। ওই হোটেলের গোপন আস্তানায় বসেই মাস্টারমাইন্ড হাফিজ ও তার বিশ্বস্ত প্রতিনিধিরা শুটারদের সঙ্গে যৌথ বৈঠক করে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার চূড়ান্ত ছক কষে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাফিজ নিজ দায়িত্বে শুটারদের হাতে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও পর্যাপ্ত গুলি সরবরাহ করেন।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরদিন, অর্থাৎ ২৪ জুলাই সন্ধ্যা থেকে চার শুটার ও তাদের সহযোগীরা যুবদল নেতা বাবুর প্রতিটি চলাচলের ওপর নজরদারি ও অনুসরণ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা রাত ৩টার দিকে মিরপুর-১৩ নম্বর সেকশনের ই-ব্লকে অবস্থিত ওপেক্স গার্মেন্টসের প্রধান ফটকের সামনে এসে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। এতে সেখানে অবস্থানরত বাবুর সহকর্মীদের মনে মারাত্মক সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং তারা এগিয়ে এসে শুটারদের পরিচয় জানতে চেয়ে চ্যালেঞ্জ করেন।

পরিস্থিতি বেগতিক টের পেয়ে কিলাররা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করলে যুবদল কর্মী ইউসুফ এক শুটারকে পিছন থেকে শক্ত করে জাপটে ধরেন। এ সময় ওই শুটার নিজের কোমর থেকে পিস্তল বের করে ইউসুফের বুকে ঠেকিয়ে সরাসরি গুলি চালায়। এতে মূল টার্গেট যুবদল নেতা বাবু অলৌকিকভাবে জীবন বাঁচিয়ে বেঁচে গেলেও ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অকুতোভয় কর্মী ইউসুফ। পরবর্তীতে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে। গুলিবর্ষণের এই ঘটনায় নালাম সরদার নামের ৪৫ বছর বয়সী এক সবজি বিক্রেতা ও মনির হোসেন নামের ৩২ বছর বয়সী এক পথচারী গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ৬ তারিখেও কাফরুলের একটি গাড়ির গ্যারেজে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার প্রথম পরিকল্পনা করেছিলেন হাফিজ। তবে ওই দিন রাতে ফুটবল বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ খেলা থাকায় রাজপথে মানুষের ভিড় বেশি থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

হত্যার ঘটনার পরপরই উপস্থিত ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা অস্ত্রসহ শুটার চঞ্চল মোল্লাকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়ে নিকটস্থ টহল পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে কাফরুল থানা ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে যৌথ অভিযান চালিয়ে জিহাদ ও জিয়াউল হক মোল্লা জিয়াসহ কিলারদের ভাড়া করা ও এলাকা চেনানোর দায়িত্বে থাকা সহযোগী নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান এবং মো. শাফিন ছৈয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই ঘটনার নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, রাজধানীর কাফরুল এলাকায় ভবন নির্মাণকাজ (কনস্ট্রাকশন) ও ফুটপাতের বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. হাফিজুর রহমান হাফিজের সঙ্গে যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের পুরোনো বিরোধ চলে আসছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক শত্রুতা পাওয়া যায়নি; পুরো ঘটনার একমাত্র কারণ ছিল এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক লেনদেন সংক্রান্ত তীব্র দ্বন্দ্ব।

ঘটনার শিকার কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, "থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ মূলত পেশাদার ভাড়াটে শুটারদের ঢাকায় এনে হোটেলে রাখে এবং নিজের হাতে তাদের অস্ত্র তুলে দেয়। তবে আমার ধারণা, এর পেছনে শুধু হাফিজ একাই নয়, আরও বড় কোনো রাঘববোয়াল বা ইন্ধনদাতা জড়িয়ে রয়েছে।"

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, "হাফিজ নিজে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হলেও মূলত কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনির সাথে রাজনীতি পরিচালনা করতেন। জনি মিরপুরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাঁচাবাজার সমবায় সমিতির সভাপতি পদের সুযোগ নিয়ে গ্যারেজের স্থানটি হাফিজকে পরিচালনার দায়িত্বে দেন। সেখানে বসেই এই হত্যার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে।"

ডিবি পুলিশ ঘটনার তদন্তকালে মিরপুর-১০ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশে অবস্থিত ‘হোটেল প্রাইম ইন’ থেকে সিসিটিভি ফুটেজ ও জাল এনআইডি কার্ডের কপি উদ্ধার করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে শুটারদের কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হোটেলে উঠতে দেখা গেছে। হোটেলের রেজিস্টারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যশোরের বাসিন্দা পরিচয় দেওয়া হয়েছিল।

মামলার বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, "ঘটনার পর পৃথক দুইটি হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। বেশ কয়েকজন কিলারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মূল পরিকল্পনাকারী পলাতক হাফিজকে গ্রেপ্তারে জোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"

নিহত ইউসুফ আলী (৪৫) বরিশাল জেলার উজিরপুর এলাকার সন্তান এবং তিনি পরিবারসহ কাফরুলে বসবাস করতেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বর্তমানে গুলিবিদ্ধ অন্য দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।



এ সম্পর্কিত আরো খবর