ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের

‘আটবার নদী ভাঙনে ঘর হারিয়েছি, আর কতবার ঘর হারালে স্থায়ী বাঁধ পাবো?’


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৭ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১০:২৪ এএম

নীলফামারী প্রতিনিধি

“বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, তখন আমাদের ঘর ছিল তিস্তা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ থেকে অনেকখানি দূরে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে একে একে জীবনের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত আটবার আমাদের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে ভেঙে চুরমার হয়েছে। এখন আর জানা নেই, ঠিক কতবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হারালে সরকার আমাদের নিরাপত্তার জন্য একটা স্থায়ী টেকসই বাঁধ বানিয়ে দেবে।”

কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জমে ওঠে নোনা জল আর কণ্ঠে ভর করে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। ষাটোর্ধ্ব অফেজা বেগম নামের এক বৃদ্ধা তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের জীবনের ট্র্যাজিক গল্প বলছিলেন। তাঁর পেছনে তাকালেই শোনা যায় তিস্তা নদীর প্রলয়ঙ্করি গর্জনের শব্দ, আর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে নদীভাঙনের নিষ্ঠুর ক্ষতচিহ্ন। যে উঠানে পা রেখে তিনি নিজের কষ্টের স্মৃতিচারণ করছিলেন, চরম নির্মমতায় সেই উঠানের অর্ধেক অংশ ইতোমধ্যে গিলে খেয়েছে উত্তাল তিস্তা নদী।

অফেজা বেগম নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাতুনামা গ্রামের কেল্লাপাড়া এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা। স্বামী তোয়াল উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরম মমতায় গড়ে তোলা বসতভিটা রক্ষায় তিস্তার ভাঙনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বিধিবাম, প্রকৃতির এই অসম যুদ্ধে জয় মেলেনি কখনোই। তিস্তার করাল গ্রাস বারবার কেড়ে নিয়েছে তাঁদের মাথা গোঁজার ঘর, আঙিনা, ফলের বাগান, আবাদি জমিসমূহ, চিরচেনা স্মৃতি আর সচ্ছলতার জীবনের স্বপ্ন।

অফেজা বেগমের মতো এমন করুণ ও অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি অসংখ্য পরিবার বসবাস করছে কেল্লাপাড়া ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ নদী তীরবর্তী এলাকায়। সেখানকার বাসিন্দাদের জীবন যেন তিস্তার ক্ষিপ্র স্রোতের সঙ্গে অবিরত বাঁধা পড়ে আছে। বছরের পর বছর তীব্র ভাঙন আতঙ্কে কাটে তাঁদের একেকটি দিন। বর্ষা মৌসুমের আগমন ঘটলেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সামলে বস্তায় বন্দি করে রাখতে হয় তাঁদের। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে কেবলই শুনতে হয় নদীর পাড় ধসে পড়ার বিকট শব্দ। কখনো মাঝরাতে ঘর ভেঙে আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে, আবার কখনো বা চোখের সামনে নিজের সাধের টিনের ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য নীরবে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে।

সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, কিছুদিন আগে তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। সেসময় নদী তীরবর্তী নিম্নঞ্চলের শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নদী থেকে পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতেই শুরু হয়েছে মারাত্মক নদীতীর ভাঙন। ইতোমধ্যে সেখানে অন্তত পাঁচটি পরিবারের বসতবাড়ি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কোনো কোনো পরিবার তড়িঘড়ি করে ঘরের টিন ও আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে, আবার কেউ ভাঙনের তীব্র আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অনেকের বসতঘরের একেবারে দোরগোড়ায় ভাঙন ধরেছে, কারও আবার উঠানের সিংহভাগ বিলীন হয়েছে। বসতবাড়ি তিস্তায় বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি গৃহস্থালি জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার আকুল চেষ্টা চালাচ্ছেন বাসিন্দারা। গত কয়েকদিন ধরে নদীপাড়ের বহু পরিবারে রান্নার চুলা পর্যন্ত জ্বলেনি; শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে তাঁদের। একই সঙ্গে তীব্র বিশুদ্ধ খাবার পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাদ্য সংকটে দিন কাটাচ্ছেন দুর্গত বাসিন্দারা।

ঘটনাস্থলে আরও দেখা যায়, কেল্লাপাড়া এলাকা থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে বহুদূরে কোথাও ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার যাদের অন্য কোথাও সামান্য জমিও নেই, তারা বর্তমান ভাঙন স্থান থেকে সামান্য দূরে নতুন করে বাঁশ ও টিন দিয়ে অস্থায়ী ছাপরা ঘর তুলছেন।

দুর্গত অফেজা বেগম জানান, বিয়ের পর যে সংসারে এসেছিলেন, সেটি ছিল নদী থেকে অনেকটা দূরে। সেখানে চমৎকার টিনের ঘর, রঙিন ফলের বাগান আর চাষবাসের সমৃদ্ধি ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নদীর গতিপথ বদলে সব শেষ হয়ে যায়। বারবার নতুন করে ঘর গড়ে তোলার পরেও তা রক্ষা হয়নি। এবারও আটবার ঘর সরানোর পর এখন নতুন করে ঘর তোলার মতো একখণ্ড জমিও অবশিষ্ট নেই।

কেল্লাপাড়ার অপর বাসিন্দা আমেনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিস্তা নদী সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। বর্ষা এলে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সেখানকার মানুষ কোনো সাময়িক ত্রাণ চায় না; স্থায়ী টেকসই নদী বাঁধের দাবি তাদের। অন্য বাসিন্দা আবু তালেব ও রহিমা বেগম আক্ষেপ করে জানান, প্রতি বছর বর্ষা এলেই তাদের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। সরকারের কাছে তাদের আকুল দাবি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক যাতে জীবনের বাকি দিনগুলো তারা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারেন।

সার্বিক ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে ডিমলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি জানান, নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। কেল্লাপাড়া এলাকার নদীর ভাঙন রক্ষায় বর্তমানে প্রায় ২৮ লাখ টাকা বাজেটে জরুরিভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান জানান, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি বা বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের মাঝে পর্যাপ্ত শুকনো খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর