কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে তীব্র সংকট ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক নৌপথে সব দেশের জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের লক্ষ্যে ওমানের দেওয়া যৌথ নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ভাগাভাগির নিরপেক্ষ প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। উল্টো পুরো হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের একক ও একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান।
বিশ্বখ্যাত মালাক্কা প্রণালির যৌথ পরিচালন ব্যবস্থার আদলে ওমান সম্প্রতি একটি নিরপেক্ষ আঞ্চলিক কাঠামোর লিখিত প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে তৈরি এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যতামূলক টোল আরোপের একতরফা পদক্ষেপ ঠেকানো। এতে বলা হয়েছিল, চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে সংগৃহীত অর্থ যৌথভাবে নিরাপদ নৌ চলাচল, সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা এবং জরুরি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে ব্যয় করা হবে।
তবে মঙ্গলবার ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাওয়াদি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, ওমানের উপস্থাপিত প্রস্তাবটি ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ মেটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিবর্তে তেহরানের দাবি, একটি আন্তর্জাতিক শিপিং লেন পুরোপুরি এবং দ্বিতীয়টির একাংশ সরাসরি ইরানের নিজস্ব জলসীমার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে হবে; যাতে আসা-যাওয়া করা প্রতিটি জাহাজের ওপর তারা নিবিড় নজরদারি ও পূর্ণ পর্যবেক্ষণ রাখতে পারে। গারিবাওয়াদি আরও জানান, সাগরে মাইন আতঙ্কের কারণে দীর্ঘদিন অচল থাকা পুরনো আন্তর্জাতিক 'ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম' রুটকে তারা আর কোনো স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নিজস্ব সীমানায় তৃতীয় কোনো দেশকে মাইন অপসারণের কাজ করতে দেওয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে দৈনিক জ্বালানি-বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরান এই কৌশলগত নৌপথটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের সীমিত সমঝোতায় পথটি আংশিক চালু হলেও, নতুন করে ইরানি হামলার অভিযোগ তুলে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে সেই অন্তর্বর্তী চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যায়। টানা ১৩ দিন ধরে চলা তীব্র মার্কিন হামলার পর গত শুক্রবার থেকে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত রয়েছে।
এমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই সোমবার ওমান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে যৌথ কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রচেষ্টার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাওয়াদি জানান, ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রই মূল আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং ইরানের ওপর আর কোনো নতুন সামরিক হামলা না চালানোর অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, কূটনীতিক আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সাধারণ অবকাঠামোতে হামলা এড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তেহরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর জলসীমা অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ জুলাইয়ের পর থেকে তারা অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং চারটি জাহাজ আটক অথবা বিকল করতে সক্ষম হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের মতে, ওমানের এই নিরপেক্ষ প্রস্তাবটি গৃহীত হলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও অবরুদ্ধ ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ অনেকখানি কমে যেত। বর্তমানে প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সাধারণ ইরানি নাগরিকরা চরম মূল্য চোকাচ্ছেন ও দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ বাণিজ্য পথটি দ্রুত চালু দেখতে চাইলেও, ইরানের কট্টরপন্থী সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখার অনমনীয় অবস্থানের কারণে শান্তির এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল।