ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

ভূমধ্যসাগর থেকে রাশিয়ার রণাঙ্গনে তরুণরা

বিশ্ব মানবপাচার-বিরোধী দিবস:  প্রতারণার নতুন ফাঁদে বাংলাদেশিরা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১১:১২ এএম

বিজ্ঞাপনে পদের নাম—আইটি অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি এক্সিকিউটিভ, কল সেন্টার কর্মী কিংবা নিরাপত্তাকর্মী। বেতন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ভিসাও সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণের আশায় বিদেশে পৌঁছানোর পরপরই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন। এরপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে বন্দি করে বাধ্য করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকিউরেন্সি, রোমান্স ও ভুয়া বিনিয়োগ সংক্রান্ত নানা ডিজিটাল প্রতারণায়। নির্ধারিত লক্ষ্য বা টার্গেট পূরণ না হলেই নামিয়ে আনা হয় ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক। কারও করুণ গন্তব্য হচ্ছে দূরদেশের অনাকাঙ্ক্ষিত স্ক্যাম সেন্টার, কারও লিবিয়ার ভয়াবহ বন্দিশালা, আবার কারও শেষ ঠিকানা হচ্ছে রাশিয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্র। উন্নত জীবনের স্বপ্ন এভাবেই আধুনিক দাসত্বে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের তারুণ্যকে।

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের ৯৮ শতাংশই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি। উল্টো তাদের ৯০ শতাংশকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সাইবার জালিয়াতিতে বাধ্য করা হয়েছে। এই ভয়াবহ ও করুণ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানবপাচার-বিরোধী দিবস। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাই তারিখটিকে বিশ্ব মানবপাচার-বিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।

কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনের আইটি বা কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচার করা হচ্ছে, যা বর্তমানে মানবপাচারের এক চরম নতুন রূপ ধারণ করেছে। দেশের উদীয়মান তরুণ সমাজকে সেখানে কার্যত আধুনিক ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। সম্প্রতি এই মানবপাচার চক্রের মূল হোতাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে অন্তত ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের পর দেশে ফিরে এসেছেন ৫৮৩ জন। ফেরত আসা ব্যক্তিদের সিংহভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের ৯৮ শতাংশই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোরপূর্বক সাইবার স্ক্যামে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে, ৮৮ শতাংশের সার্বিক চলাফেরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ছিল এবং ৮৬ শতাংশের মূল পাসপোর্ট ও ভিসা কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ২৭ শতাংশ সরাসরি শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মারাত্মক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে মূলত ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বিদেশে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত কিছু অসাধু বাংলাদেশি দালাল তাদের চীনা-নিয়ন্ত্রিত গোপন স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেয়। এক ভুক্তভোগী তার করুণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সেখানে তাঁর নিজের কোনো নাম ছিল না, তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল একটি গোপন কোড নম্বর। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় পাচারকারীদের দেওয়া সেই কোড শব্দটি বলতে বলা হয়েছিল, যা ছিল মূলত পাচারকারীদের একটি গোপন সাংকেতিক চিহ্ন।

অপর এক ভুক্তভোগী জানান, কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির আশায় তিনি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালদের হাতে। বিএমইটির ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা। বিমানবন্দর থেকে নামার পরই দালালরা তাঁকে সরাসরি একটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়। সেখানে দৈনন্দিন টার্গেট পূরণ না হলে মিলত রড দিয়ে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক। সেখানে ছিল আলাদা টর্চার সেল। পরবর্তীতে বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মুখে অপরাধীরা পালিয়ে গেলে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে মুক্ত হন।

এর আগে মিয়ানমারের একটি গোপন স্ক্যাম সেন্টার থেকে আট জন এবং তারও আগে আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছিলেন। চাকরির লোভ দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা জানান, সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ এক বৈশ্বিক রূপ। কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ ও কাস্টমার সার্ভিসের মতো আকর্ষণীয় পদের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া ওয়েবসাইট ও নানা বার্তা আদান-প্রদানকারী অ্যাপের মাধ্যমে তরুণদের নিয়োগের প্রলোভন দেখানো হয়। পরবর্তীতে তাঁদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাইবার অপরাধে বাধ্য করা হয়। ফলে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের সত্যতা এবং ভিসার ধরণ সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভালোভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় আবারও বিশ্বে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশিরা। ফ্রন্টেক্সের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জানানো হয়, বিগত বছরগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে বিপজ্জনক সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয় রুট ব্যবহার করে ইতালিতে প্রবেশের হার সবচেয়ে বেশি। লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় হাজার হাজার মানুষ বন্দিশালায় ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং অনেকে সাগরে সলিলসমাধি লাভ করছেন। দেশের নির্দিষ্ট ১০ থেকে ১২টি জেলা থেকে এই বিপজ্জনক অভিবাসনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

মানবপাচারের আরেকটি ভয়াবহ ও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক বা কারখানার লোভনীয় চাকরির প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা নিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের। সেখানে পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠিয়ে দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধে একাধিক বাংলাদেশি তরুণের প্রাণহানির ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরির নামে নারীদের নিয়ে গিয়ে ভিন্ন পেশায় ও যৌন শোষণে বাধ্য করার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটছে। আবার কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী সাগরে ট্রলার ভাসিয়ে দেওয়ার বিপজ্জনক মানবপাচার চক্র এখনও সক্রিয় রয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি তরুণরা সমানভাবে শিকার হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক মানবপাচার-বিরোধী দিবসে বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিচ্ছেন, অপরাধ দমনে কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। একই সাথে সাইবার স্পেসে ফাঁদ পাতা এসব আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর আইনি নজরদারি জোরদার করা অপরিহার্য।


এ সম্পর্কিত আরো খবর