ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

মরক্কো সীমান্তে জনসমূদ্র

সেউতায় ঢুকেছেন ৬০ হাজার অভিবাসী, প্রাণ গেল ৫৭ জনের


  • আপলোড সময় : শনিবার ০১ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১১:০২ এএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সেউতায় রাতারাতি মরক্কো থেকে আনুমানিক ৬০ হাজার অভিবাসীর নজিরবিহীন ও বিশৃঙ্খল অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ভৌগোলিক ও আইনি সুযোগ নিয়ে সংঘটিত এই বিশাল সীমান্ত পারাপারের চেষ্টার সময় অন্তত ৫৭ জন অভিবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জরুরি ভিত্তিতে সেউতা পরিদর্শনে যান এবং এ ঘটনাকে স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার মারাত্মক লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবাধ চলাচলের সেনজেন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।

পেছনের গল্প ও আইনি বিভ্রান্তি:

সংকটজনক এই সীমান্ত পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে আইনি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা এবং মানব পাচারকারী মাফিয়া চক্রের অপপ্রচার। সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে নির্দেশ দেয় যে—সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের সরাসরি বা অবিলম্বে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। আদালতের এই রায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মানদণ্ড নিশ্চিত করা। কিন্তু মানব পাচারকারী চক্র এই রায়ের একটি স্বার্থান্বেষী ও মনগড়া ব্যাখ্যা তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সীমান্ত এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করতে থাকে যে, সীমান্ত এখন পুরোপুরি অরক্ষিত এবং স্পেন সরকার কাউকে ফেরত পাঠানোর আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এই গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে উত্তর আফ্রিকার হাজার হাজার মানুষ ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় সীমান্ত অভিমুখে যাত্রা করে।

সীমান্তের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা ও নিরাপত্তা সংকট:

গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে হঠাৎ করেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়ে। উত্তর আফ্রিকার উপকূলে জিব্রাল্টার প্রণালী দ্বারা মূল স্পেনীয় ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেউতা বহু বছর ধরেই ইউরোপগামী অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবারের ঘটনা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সাধারণত অভিবাসীরা উপকূলের দূরবর্তী এলাকা থেকে সমুদ্রে সাঁতার কেটে আসার চেষ্টা করলেও এবার মরক্কো সীমান্তের বেড়া ও জেটির কাছে খুব সহজেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে সক্ষম হয়। অনেকে জেটির পাথর ধরে আবার বিশাল অংশ সমুদ্রের স্বল্প দূরত্ব সাঁতরে সেউতার সৈকতে গিয়ে উপস্থিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মরক্কোর সীমান্তরক্ষীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে এত বড় জনস্রোত বাধা না পেয়ে একদম সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

জনসংখ্যার ভয়াবহ অনুপাত ও ক্ষয়ক্ষতি:

সেউতার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ছিটমহলটির মোট জনসংখ্যা মাত্র ৮৩ হাজার ৬০০ জন। সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস বিভাস উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় আসা অভিবাসীদের সংখ্যা এই শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। অন্যদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি-কে জানিয়েছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রাক্কলন অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোর থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশকারীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

এই বিশাল জনস্রোতের মধ্যে নারী, শিশু এবং এমনকি কোলের শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় যারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে তাদের মধ্যে অন্তত ৭ হাজার জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। সমুদ্র পারাপারের সময় চরম বিশৃঙ্খলা ও ডুবুরি সংকটের মুখে পানিতে ডুবে ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় ৫৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়।

মানবিক বার্তা ও বর্তমান অবস্থা:

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফেরত যাওয়া এক অভিবাসী সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে নিজের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, "এখানে আসাটা মোটেও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয় এবং এটি কোনো মজার বিষয়ও নয়। চোখের সামনে মানুষ মারা যাচ্ছে। যারা এখনও আসার পরিকল্পনা করছেন, তাদের কাছে আমার আকুল অনুরোধ—দয়া করে কেউ আসবেন না।" প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার ভয়াবহতা ও স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৪৮ হাজারেরও বেশি অভিবাসী স্বেচ্ছায় পুনরায় মরক্কোর সীমান্তে ফিরে গেছে।

স্পেন সরকারের পদক্ষেপ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

জরুরি সেউতা পরিদর্শনের সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধী মাফিয়া চক্র সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুযোগ নিয়ে চক্রান্ত করেছে। তিনি আরও বলেন, সীমান্ত সুরক্ষায় মরক্কো সরকারের সাথে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে এবং যারা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করেছে তাদের ফেরত পাঠাতে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। একই সাথে স্পেন সরকার সেউতা ও এর পার্শ্ববর্তী সিস্টার সিটি মেলিলায় অতিরিক্ত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে। মেলিলাতেও রাতের বেলা প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি সীমান্ত পারাপারের ঘটনা ঘটেছে।

পরিসংখ্যানগত চিত্র:

জাতিসংঘের প্রকাশিত অভিবাসন তথ্য পর্যালোচনা করে বিবিসি ভেরিফাই দেখিয়েছে যে, আগের বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর সেউতা ও মেলিলায় অনুপ্রবেশের মাত্রা ছিল চরম অস্বাভাবিক। জাতিসংঘের হিসাবমতে, চলতি বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ২,৮২৬ জন সেউতায় এবং ১৮১ জন মেলিলায় প্রবেশ করেছিল। অথচ পূর্ববর্তী বছরগুলোতে গোটা বছরে মোট প্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল—২০২৫ সালে ৯৯৪ জন, ২০২৪ সালে ৪৭৬ জন এবং ২০২৩ সালে মাত্র ৪৬৭ জন। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় হঠাৎ এই অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, মানব পাচারকারীদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এক অভূতপূর্ব সীমান্ত সংকট তৈরি করেছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর