আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর মিরামার এয়ার স্টেশনের কাছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি এফ-৩৫বি স্টেলথ যুদ্ধবিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি পরিস্থিতিতে পাইলট নিরাপদ ইজেক্ট করতে সক্ষম হওয়ায় প্রাণহানি এড়ানো গেছে। শনিবার (১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
দুর্ঘটনার বিবরণ ও উদ্ধার অভিযান:
মার্কিন মেরিন কোর জানিয়েছে, শুক্রবার সান দিয়েগোর ঐতিহাসিক মিরামার সামরিক ঘাটির কাছে এফ-৩৫বি মডেলের যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পাইলট ইজেক্ট করে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এতে তিনি সামান্য আহত হলেও আঘাত প্রাণঘাতী নয় বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযানের কিছু ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, খোলা ধূলিময় মাঠে বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেখানে একাধিক সামরিক গাড়ি ও ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটারদের সাদা রঙের অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক প্রয়োগ করতে দেখা যায়। সান দিয়েগো ফায়ার ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ক্যান্ডেস হ্যাডলি জানান, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ সংলগ্ন এলাকার আগুন নেভাতে তাৎক্ষণিক কাজ শুরু করে।
প্রেক্ষাপট ও মিরামার সামরিক ঘাঁটির ইতিহাস:
যে এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সেই ক্যালিফোর্নিয়ার মিরামার বিমানঘাঁটিটি মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এই ঘাঁটিটি 'ফাইটারটাউন ইউএসএ' নামে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ছিল। বিখ্যাত হলিউড সিনেমা ‘টপ গান’-এ প্রদর্শিত মার্কিন নৌবাহিনীর ফাইটার পাইলট ট্রেনিং স্কুলটি মূলত এই ঘাঁটিতেই অবস্থিত ছিল। ১৯৯৬ সালে ঘাঁটিটি মার্কিন মেরিন কোরের কাছে হস্তান্তর করার পর ঐতিহাসিক ওই প্রশিক্ষণ স্কুলটি নেভাডার নেভাল এয়ার স্টেশন ফ্যালনে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এফ-৩৫বি ফাইটারের আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য:
গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোর, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী মিলিয়ে ৬৩০টিরও বেশি এফ-৩৫ সিরিজের যুদ্ধবিমান পরিচালনা করে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বস্ত হওয়া এফ-৩৫বি (F-35B) হলো এর মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের একটি সংস্করণ। এটি স্বল্প দূরত্ব থেকে উড্ডয়ন (Short Take-Off) এবং একদম সোজা উল্লম্বভাবে বা খারাপ আবহাওয়ায় অবতরণ (Vertical Landing) করার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন প্রতিটি এফ-৩৫বি বিমানের আনুমানিক উৎপাদন ও উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ১০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
'এ ক্লাস' ক্যাটাগরি ও পূর্ববর্তী দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান:
ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় মার্কিন মেরিন কোর এই দুর্ঘটনাকে তাদের পরিভাষায় ‘এ ক্লাস এক্সিডেন্ট’ বা সবচেয়ে গুরুতর মাত্রার দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মার্কিন সামরিক নীতিমালা অনুসারে, যেকোনো দুর্ঘটনায় বিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হলে, কোনো সামরিক সদস্য নিহত হলে কিংবা ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক পরিমাণ ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) ডলার অতিক্রম করলে সেটিকে ‘এ ক্লাস দুর্ঘটনা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
এয়ার ফোর্স সেফটি সেন্টারের তথ্যানুসারে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ থাকা সত্ত্বেও ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শুধু মার্কিন বিমান বাহিনীতেই এফ-৩৫ সিরিজের বিমানকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৭টি ‘এ ক্লাস’ দুর্ঘটনার মতো মারাত্মক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে।