ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ ও নজিরবিহীন আন্দোলনের স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে অম্লান করে রাখতে অবশেষে উন্মোচিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ঠিক ৯টায় এক ভাবগম্ভীর ও ঐতিহাসিক পরিবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নতুন নির্মিত এই জাদুঘরের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অবিনশ্বর দলিল হিসেবে গড়ে তোলা এই স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর চালুর মাধ্যমে জাতীয় ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা ঘটল।
জাদুঘর উন্মোচনের বর্ণাঢ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। উদ্বোধনী মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের স্মারক হিসেবে দুই শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করে। ফলক উন্মোচনের পর দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও আন্দোলনের চেতনাকে সমুন্নত রাখার প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
উদ্বোধনী কার্যক্রম শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। তিনি সুসজ্জিত গ্যালারিগুলো গভীরভাবে পরিদর্শন করেন, যেখানে আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর ঘটনাক্রম নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরে স্থান পাওয়া আন্দোলনের দুর্লভ আলোকচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলপত্র, শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক ও স্মৃতিচিহ্ন এবং বিপ্লবের নানা স্মারক অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিদর্শনকালে তিনি আন্দোলনকালীন নানা ঘটনার বিবরণ শোনেন এবং শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
উদ্বোধনের প্রথম দিনে জাদুঘর প্রাঙ্গণ সংরক্ষিত রাখা হয়েছে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের পরিবারের সদস্যদের জন্য। স্বজনহারা পরিবারগুলোর জন্য এই আয়োজন ছিল অত্যন্ত আবেগময়। শহীদ পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত এই সংগ্রহশালা ঘুরে দেখেন এবং আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি পরদিন বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। দেশ-বিদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে নাগরিকরা প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে এসে ইতিহাসের এই গৌরবময় স্মৃতি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবেন।
জাদুঘর দর্শনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রবেশব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীরা সহজেই অনলাইনে অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবেন। সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুদের জন্য টিকিটের মূল্য রাখা হয়েছে ২৫ টাকা। অনলাইন টিকিট ব্যবস্থার ফলে দর্শনার্থীরা কোনো ধরনের দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে টিকিট কেটে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন।
ঐতিহাসিক এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরটি মূলত তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, ছাত্র-জনতার অকুতোভয় সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের স্মৃতিগুলোকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জাতীয় বীরত্ব ও জন আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হওয়া এই জাদুঘরটি ভবিষ্যতে দেশের ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা, তরুণ প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।