ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৮:২৯ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া প্রয়োজন এবং বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।


বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।


প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ১৭ বছর এবং জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন কিংবা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে নিজ নিজ এলাকায় অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের নাম তাদের নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার স্থান হওয়া উচিত নয়। তার ভাষায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সমগ্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলন। তাই এই জাদুঘরে সেই গণমানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসই যথাযথভাবে সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।


তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। যেমন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বীরদের ভুলে যায়নি, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।


দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অহেতুক ইস্যু সৃষ্টি করে কেউ যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।


দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বর্তমান সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ সময় ধরে হাজার হাজার মানুষ গুম, অপহরণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। লাখো মানুষ হামলা, মিথ্যা মামলা এবং নিপীড়নের কারণে স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই বহু ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু প্রাণ হারিয়েছেন।


তিনি অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থান দমনে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। গুম, খুন ও অপহরণকে শাসনব্যবস্থার অংশে পরিণত করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন নৃশংসতা সভ্য সমাজে বিরল এবং ইতিহাসে তা কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।


জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জাদুঘর জনগণের আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস, সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতির অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও বাস্তব তথ্য জানতে পারবে।


তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাবলির স্মারক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাসও এখানে সংরক্ষিত হবে। শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস স্থান পাওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাসকে বিকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করলে তা ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাই প্রতিটি তথ্য যথাসম্ভব সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, জাদুঘরের তথ্য বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় উপস্থাপন করা হলে বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারবেন।


আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


তিনি আরও জানান, গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি জানান, বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ও কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হবে।


বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং পরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়।


স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। অনুষ্ঠানে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি স্মৃতিচারণ করেন।


সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আহমেদ আযম খান, আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং জাহেদ উর রহমান। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমদ, শামা ওবায়েদ ইসলাম, এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মাহদী আমিন, সালেহ শিবলী, আতিকুর রহমান রুমন এবং ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর