বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে এবং দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাপান সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সুবিধাজনক সময়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। গত বুধবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সপ্তম পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের পরামর্শ সভায় (ফরেন অফিস কনসালটেশন-এফওসি) এ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং জাপানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির সিনিয়র ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নামাজু হিরোয়ুকি। বৈঠকের সময় সিনিয়র ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নামাজু হিরোয়ুকি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির পক্ষ থেকে প্রেরিত এই নিমন্ত্রণবার্তাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৌছে দেন।
এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত ও গভীর করার বিষয়ে উভয় দেশ দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করা, সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিস্তার, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ), বিগ-বি উদ্যোগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাপানের সিনিয়র ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নামাজু হিরোয়ুকি শ্রদ্ধাভরে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের চমৎকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের শক্ত ভিত্তি একসময় গড়ে দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি এ সময় মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (এফওআইপি) গঠনে জাপানের মহাপরিকল্পনা সম্পর্কে বাংলাদেশকে বিস্তারিত অবহিত করেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি, বিগ-বি অবকাঠামোগত উদ্যোগ এবং সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে পাঁচটি উন্নত টহল নৌযান হস্তান্তর করার বিষয়টিকে দুই দেশের সম্পর্কের মাইলফলক হিসেবে স্বাগত জানান তিনি।
জাপানের ভূয়সী প্রশংসা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। তিনি বিগ-বি প্রকল্পের আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের মতো মেগা প্রজেক্টে জাপানের বিশাল অবদানের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে জাপানি সহায়তা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বাড়াতে এবং জাপানে বাংলাদেশি নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের (স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার) কাজের সুযোগ বিস্তৃত করা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রসচিব বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এই বিশাল মানবিক ও আর্থসামাজিক সংকটের একমাত্র সমাধান। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে পাশে থাকায় জাপান সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়।
বৈঠকে আরও জানানো হয় যে, ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকেও জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের তরফ থেকেও সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পরবর্তী পরামর্শ সভা ২০২৭ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত হবে।