দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, গতিশীল এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যে নতুন এক যুগের সূচনা করে দেশের আরও ১২টি জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ই-বেইল বন্ড’ বা ইলেকট্রনিক জামিননামা ব্যবস্থা। আদালতে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর কারামুক্তি প্রক্রিয়াকরণকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরাপদ ও পদ্ধতিগত ঝামেলামুক্ত করার উদ্দেশ্যেই মূলত আজ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) থেকে এই আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যাত্রা সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে এক ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই যুগান্তকারী বিচারিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
যে ১২টি নতুন জেলায় ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, রাঙ্গামাটি, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও এবং জামালপুর। বিচার বিভাগীয় সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় প্রত্যাশা, এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ফলে আদালত প্রাঙ্গণে বিচারিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত বিলম্ব ও জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে আদালত, অ্যাডভোকেট, কারা কর্তৃপক্ষ এবং বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজের বিপুল মানসিক ও কায়িক চাপ অনেকটাই লাঘব হবে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম প্রবর্তিত এই ব্যবস্থার পটভূমি ও সুফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বিচার ব্যবস্থার সার্বিক ডিজিটাইজেশন, আধুনিকীকরণ এবং আদালত থেকে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীদের অযাচিত ভোগান্তি কমানোর সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা থেকেই প্রচলিত কাগজভিত্তিক বেইল বন্ড বা জামিননামা দাখিল পদ্ধতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ আধুনিক ‘ই-বেইল বন্ড’ ব্যবস্থা চালু করার এমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই সময়োপযোগী উদ্যোগটি বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগী, কারা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা সহ পুরো বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সবার বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সময় ও অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত খরচ সাশ্রয় করতে অনন্য ভূমিকা রাখবে। এই ১২টি নতুন জেলা যুক্ত হওয়ার আগে দেশের মোট ১৬টি জেলায় সফলভাবে তিনটি পৃথক ধাপে ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থার কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল এবং সেখানে অসাধারণ ফলাফল পাওয়া গেছে।
ডিজিটাল এই ব্যবস্থার মূল বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জায়গাটি তুলে ধরে আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১) মো. আজিজুল হক জানান, পুরোনো আমলের সনাতন পদ্ধতিতে আদালতের জামিনের আদেশপত্র বা জামিননামা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে আসামির চূড়ান্ত কারামুক্তি সম্পন্ন করা পর্যন্ত বিচার বিভাগীয় কাগজপত্র পৌঁছানোর কাজে আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত অন্তত ১৩টি ম্যানুয়াল বা কায়িক ও আমলাতান্ত্রিক ধাপ অতিক্রম করতে হতো। এতে কারামুক্তিতে অনেক সময় কয়েকদিন পর্যন্ত বিলম্ব হতো এবং এতে স্বজনদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হতো। কিন্তু আধুনিক ‘ই-বেইল বন্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিবর্ধন ঘটিয়ে এখন মাত্র তিনটি প্রধান ডিজিটাল ধাপের মধ্য দিয়েই পুরো প্রক্রিয়াটি নিমেষেই এবং সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে, যা জামিন প্রাপ্তির পর বন্দির কারামুক্তির সার্বিক সময়কে অভাবনীয় মাত্রায় ত্বরান্বিত করেছে।
আদালতের জামিন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিলম্ব, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও আমলাতান্ত্রিক অযাচিত জটিলতা চিরতরে নিরসনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সর্বপ্রথম ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই যুগান্তকারী ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সেখানে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে, ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, ঝালকাঠি এবং শেরপুর—এই ৮টি জেলায় ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় ধাপে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলায় ইলেকট্রনিক এই সেবাটি সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে চালু করা হয়।
আজ আরও ১২টি জেলা নতুন করে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এই ডিজিটাইজড বিচার ব্যবস্থার সরাসরি সুফল পেতে শুরু করবেন। আদালত থেকে অনলাইন সিস্টেমে জামিননামার তথ্য সরাসরি ডিজিটাল উপায়ে সংশ্লিষ্ট কারাগারে পৌঁছে যাওয়ার কারণে কোনো ধরনের ভুয়া জামিননামা তৈরির সুযোগ থাকবে না, নিশ্চিত হবে শতভাগ স্বচ্ছতা।
একইসঙ্গে এর ফলে বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে, কারাবন্দিদের মুক্তির বিলম্বজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ হবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি দেশবাসীর আস্থা ও বিশ্বাস আরও বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সার্বিকভাবে, ডিজিটাইজেশনের এই অগ্রযাত্রা দেশের স্মার্ট বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে একটি নতুন ও উজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।