রাজধানীর উত্তরা সেক্টর-১১-তে অবস্থিত স্বনামধন্য চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং নতুন গঠিত গভর্নিং বডির দায়িত্ব নেওয়াকে কেন্দ্র করে চরম হট্টগোল, হাসপাতালের মূল ফটক ভাঙচুর ও বহিরাগতদের নজিরবিহীন অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একটি বিতর্কিত স্মারকের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও গত বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নতুন পর্ষদের সদস্যরা জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের চেষ্টা চালালে এ ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শত শত রোগীর মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত স্মারকের ভিত্তিতে গঠিত নতুন গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাসের সমর্থনে ড্যাবের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতারা সদলবলে হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা চালান। এ সময় বহিরাগত বহরের সঙ্গে ছিলেন ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, ড্যাবের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. হারুন-আল-রশিদ এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা তাদের প্রবেশে বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত হামলাকারীরা হাসপাতালের প্রবেশপথের মূল ফটকটি ভেঙে বলপ্রয়োগ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে তারা চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করে জোরপূর্বক প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা চালায় এবং বিদ্যমান কর্তৃপক্ষের কাছে একতরফা স্মারকলিপি প্রদান করে। এর আগে গত ১১ আগস্ট পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে আগাম চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সভা আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পাসে একধরনের কৃত্রিম নিরাপত্তাঝুঁকি ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়। তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এটিই প্রথম নয়; এর আগে গত ৪ আগস্টও একদল বহিরাগত অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে তীব্র হট্টগোল ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশাসনিক আদেশ। গত ৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক এক স্মারক (স্মারক নম্বর: ৪৭৫/ক.প.) জারি করে মেডিকেল কলেজটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। ওই স্মারকে নতুন চেয়ারম্যানসহ শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসেবে বেশ কয়েকজন নতুন মুখকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই একতরফা পদক্ষেপকে ‘বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল আইন, ২০২২’-এর ১৮(২) ও ১৮(৩) ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও বেআইনি বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সংস্থা শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্ট। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, ট্রাস্টের গঠিত বোর্ডই কলেজের সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ হিসেবে গণ্য হবে এবং সেখানে বাইরের কোনো কর্তৃপক্ষের বেআইনি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্টের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নম্বর: ১০৮৬৭/২০২৬) দায়ের করা হয়।
আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট বিচারপতি রাজিক-আল-জালিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে রিট পিটিশনটির প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শকের জারি করা উক্ত স্মারকটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি ৩ সপ্তাহের রুল জারি করেন। তবে রিট পিটিশনের রায়ে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে ওই স্মারকের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ না দেওয়ায়, সেই আইনি ফাঁকফোকর ও কারিগরি সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন পর্ষদের সদস্যরা গায়ের জোরে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটও এই পেশাগত দ্বন্দ্বকে উস্কে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এই সুযোগে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে বিএনপি-সমর্থিত চিকিৎসকদের একক প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও আইনগত জটিলতার কারণে মূল প্রশাসনিক পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মেডিকেল কলেজের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এই আগ্রাসী চেষ্টা সাধারণ শিক্ষক ও চিকিৎসকদের মনে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর ও বহিরাগতদের জোরপূর্বক দখলের অপচেষ্টায় উত্তরার এই প্রধান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে ভর্তি থাকা শত শত রোগী এবং তাদের স্বজনেরা তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। একই সাথে শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যকার প্রকাশ্য বিভাজন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও একাডেমিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ বিষয়টি যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারাধীন রয়েছে, তাই আইনগতভাবে কোনো পক্ষেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা জোরপূর্বক প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। অবিলম্বে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতের মাধ্যমে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান ঘটিয়ে হাসপাতালটির সেবামূলক ও শিক্ষামূলক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।