ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬,  ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

যাচাইকরণ শেষ

তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত মিয়ানমার


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৫:৫০ পিএম

বাংলাদেশে আশ্রিত তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যেরই মূল বাসিন্দা বলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার ও নিশ্চিত করেছে দেশটির সামরিক জান্তা-সমর্থিত সরকার। রাখাইন রাজ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে পর্যায়ক্রমে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই সংক্রান্ত একটি বিবৃতি প্রদান করা হয়। এমন এক সময়ে এই ঘোষণা সামনে এলো, যখন রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নবম বছরে পদার্পণ করেছে।

বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তালিকায় থাকা মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তথ্য যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চালায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। জুলাই মাসের শেষ নাগাদ তারা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জন শরণার্থীর তথ্য পরীক্ষা করে দেখেছে। এই যাচাইকৃত অংশ থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন শরণার্থী রাখাইন রাজ্যের স্থায়ী ও বৈধ বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত ও নিশ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, প্রমাণের অভাবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জন তথাকথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাখাইন অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত বাসিন্দাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক কাজ অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে একটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকটি সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণ চালায়। এই ঘটনার জেরে মিয়ানমার জান্তা বাহিনী রাখাইনজুড়ে নজিরবিহীন ও বর্বর সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে এবং অত্যাচার থেকে বাঁচতে সীমান্ত পার হয়ে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। তবে ২০১৭ সালের এই ঘটনার বহু আগে থেকেই কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করে আসছিল।

ঐতিহাসিক সেই সামরিক অভিযানের ভয়াবহতা, সংগঠিত রূপ এবং চরম নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রত্যক্ষ অভিযোগ আনে। বার্মা নামে পরিচিত মিয়ানমার রাষ্ট্র শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের তাদের দেশের ১৩৫টি বৈধ জাতিগত সংখ্যালঘুর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। বরং তারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বা বিদেশি হিসেবে অভিহিত করে এটি প্রমাণের চেষ্টা চালায় যে, এরা বাংলাদেশের বাসিন্দা এবং অবৈধভাবে রাখাইনে বসতি স্থাপন করেছিল।

তবে রাখাইন থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবিকে শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেই সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং ২ লাখেরও বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনেই থেকে যায়।

এদিকে ২০২১ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে অং সান সু চির নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার পর দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যার ফলে শরণার্থীদের নিজ ভিটায় ফিরিয়ে নেওয়ার সব ধরনের আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ ব্যাহত হয়।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আঞ্চলিক জাতিগত গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র সাথে সামরিক বাহিনীর নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। সংঘাতের ভয়াবহতায় জীবন বাঁচাতে নতুন করে অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। সম্প্রতি সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ঘাঁটি দখলের মাধ্যমে আরাকান আর্মি এখন রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ অঞ্চলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা ও মানবেতর জীবনযাপন, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার বরাদ্দ বা তহবিল হ্রাস পাওয়া এবং নিজ জন্মভূমিতে প্রত্যাবাসনের টেকসই পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় কক্সবাজারের শিবিরগুলো থেকে প্রতিনিয়ত বিপদের ঝুঁকিতে পড়ছে আশ্রিতরা। জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে কাঠের জরাজীর্ণ নৌকায় করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে শত শত রোহিঙ্গা।

চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর দেশে অবস্থানরত আটক কেন্দ্রগুলোর ৫,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার সরকার। কিন্তু পরবর্তীতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হান উইন অং জানান, প্রত্যাবাসন উদ্যোগটি শুধু মালয়েশিয়ার সরকারি আটক কেন্দ্রে থাকা যাচাইকৃত নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য, সাধারণ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থায়ী প্রত্যাবাসনের সরকারি কোনো সিদ্ধান্তের খবরকে তিনি সে সময় খণ্ডন করেন। শেষ পর্যন্ত ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের বাসিন্দা বলে স্বীকার করায় প্রত্যাবাসনের নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি হলো, যদিও তা নির্ভর করছে রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।


এ সম্পর্কিত আরো খবর