ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নিখোঁজ ও চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে অনুসন্ধান তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তর। বিভিন্ন বিধ্বস্ত বাড়ি-ঘর ও ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকের মরদেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। মার্কিন সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূকম্পনটির উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার ছিল দেশের পূর্বাঞ্চলীয় পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের এন্দে শহর থেকে ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাগরের তলদেশে এবং এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার।
মূল ভূকম্পনের পর অঞ্চলটিতে কয়েকটি শক্তিশালী 'আফটার শক' বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আফটার শকের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১। প্রবল ঝাঁকুনিতে পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার বেশ কয়েকটি শহরের অসংখ্য ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পের ফলে তৈরি হওয়া আতঙ্কের চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ধসে পড়ছে একের পর এক ভবন এবং প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা মানুষ খোলা আকাশের নিচে ছোটাছুটি করছেন। পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের সিক্কা শহরের বাসিন্দা ইয়োহান্না এমবু জানান, চোখের সামনে বন্দর এলাকার ভবন ভেঙে পড়তে দেখেছেন তিনি। অনেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় পুরো এলাকায় চরম হাহাকার তৈরি হয়েছে।
প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘুমের মধ্যেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ৫৪টি বাড়ি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তিনটি উপাসনালয়, ছয়টি সরকারি ভবন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাংগারাই প্রদেশকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর সম্ভাব্য ভয়াবহ সুনামির আশঙ্কায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে সরে যাওয়ায় উপকূলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সতর্কতা জারির পরপরই প্রায় দুই হাজার মানুষ নিজ উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে এবং পাহাড়ের দিকে সরে যান। অনেকে মোটরসাইকেলে করে দ্রুত উপকূলীয় অঞ্চল ত্যাগ করেন। তবে প্রায় তিন ঘণ্টা পর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি না পাওয়ায় সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয় স্থানীয় প্রশাসন।
তালিবুরা গ্রামের বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তো এবং নাগেকেও শহরের সাধারণ বাসিন্দারা ভয়াবহ সেই মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে জানান, বাজার ও আবাসিক এলাকায় প্রচণ্ড কম্পন শুরু হলে দিশেহারা মানুষ চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি করতে থাকেন। বহু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেও রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ভৌগোলিকভাবে ১,৭০০টি দ্বীপের সমষ্টি ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের অত্যন্ত সক্রিয় 'রিং অব ফায়ার' বা আগ্নেয় মেখলা অঞ্চলে অবস্থিত। টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার কারণে দেশটিতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। ২০০৪ সালে সংঘটিত ৯ দশমিক ১ মাত্রার প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প ও সুনামিতে দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়।