ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬,  ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গাজীপুর আদালতে এক বিচারপ্রার্থীর অভিজ্ঞতা: আইনি পেশার মর্যাদা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে এসে আটক যুবলীগ কর্মী অর্ণব দাস দুই আসামির ফাঁসির আপিল হাইকোর্টের কার্যতালিকায় সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে মিলল বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড ব্রিটেনকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বলে নজিরবিহীন কটাক্ষ নেতানিয়াহুর বাংলাদেশে নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে প্যারাকোয়াট হাসানের পর তাইজুলের আঘাত, চাপে অস্ট্রেলিয়া ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হলো ঢাকার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম: চলতি বছরে ১০৪ বার সমন্বয় ওয়েদারাল্ডের পর এবার ট্রাভিস হেডকেও বোল্ড করলেন হাসান

ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নতুন রণতরি ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৯:৪৭ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি পরিবর্তন করার বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইরানের ওপর সামরিক হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ঐতিহাসিক মার্কিন বিমানবাহী রণতরি 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন'-কে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই শক্তিশালী রণতরির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আরেক সামরিক যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন'-কে উক্ত অঞ্চলে মোতায়েন করা হচ্ছে।

 

দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করার কারণে লিংকন রণতরিতে থাকা নাবিকদের প্রচণ্ড মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যগত অবনতি এবং নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতার খবর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই মূলত পেন্টাগন থেকে এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তবে সামরিক জাহাজের পরিবর্তন অভ্যন্তরীণ এমন টানাপোড়েন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের সঙ্গে সামরিক যুদ্ধবিরতি বিষয়ক আলোচনায় সৃষ্ট চরম অচলাবস্থা না কাটলে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতেঅনির্দিষ্টকালেরজন্য নৌ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার এক কঠোর অনমনীয় ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি বর্তমানে তাদের সামরিক বাহিনীরপূর্ণ নিয়ন্ত্রণেরয়েছে।

 

 তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের পাল্টা দাবি, হরমুজ প্রণালির মূল নিয়ন্ত্রণ কেবল তাদের সামরিক বাহিনীর হাতেই রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরোপিত অর্থনৈতিক শর্তগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই এই পথ খুলে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। তেহরানের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে তাদের ওপর অর্পিত সমস্ত আন্তর্জাতিক মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং বিদেশি ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের জাতীয় সম্পদ দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া।

 

মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রণতরি জর্জ ওয়াশিংটন পাঠানোর এই সিদ্ধান্তটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে একাধারে উন্মুক্ত সমুদ্রে অবস্থান করছে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা এই বিশাল জাহাজের নাবিকদের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট, পানির বিষাক্ততা বা দূষণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে আইনপ্রণেতাদের এসব উদ্বেগের প্রতিবেদনকেসম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিতবলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এছাড়া মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, দীর্ঘ এই অভিযানে জাহাজের কোনো নৌ সদস্যের প্রাণহানি ঘটেনি। কেবল আগস্ট ভুলবশত জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে যাওয়া এক নাবিককে দ্রুত অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

 

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরির মতো অত্যন্ত জটিল সংবেদনশীল যুদ্ধজাহাজের নানাবিধ জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ খোলা সমুদ্রে করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসমান থাকলে জাহাজের সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি কার্যক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে লোপ পেতে থাকে। কারণ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা প্রায় ২০০ দিন কোনো বন্দরে নোঙর করার সুযোগ পায়নি। ফলে জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো কেবল সাধারণ জাহাজ রদবদল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর তৈরি হওয়া অসামান্য চাপেরই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। ইতিমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে জর্জ ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।

 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাফ জানিয়ে দেন যে, ইরানের উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সক্ষম। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে একটির পর একটি সামরিক জাহাজ বদলে দিয়ে এই কঠোর অবরোধ দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া হবে।

 

একই দিনে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ দ্বিগুণ করার হুঙ্কার দিয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার অধীনে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের কথা ছিল। কিন্তু সেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং দুটি দেশই আবারও নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় জড়িয়ে পড়ে। সেই ৬০ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা অচিরেই শেষ হতে চললেও দুই দেশের নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

 

বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই সামরিক রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ধসে পড়েছে। যুদ্ধের পূর্বে এই ব্যস্ততম পথ দিয়ে দৈনিক ১৩০ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রতিদিন গড়ে মাত্র আট থেকে বারোটিতে এসে ঠেকেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত, যেখান দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি হয়ে থাকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই দীর্ঘায়িত অবরোধ কৌশল এবং কৌশলগত জলপথ হরমুজকে ইরান দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখায় পুরো বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত রূপ ধারণ করছে।

আকাশজমিন/ আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর