ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,  ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাকরির বহাল তবিয়তে ওকালতি! বিপাকে সরাইল থানার ওসি রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন নারিতায় বিমানে ত্রুটি: সফরসঙ্গীদের নিয়েই দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তাহসিফ হত্যা রহস্য: জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বন্ধু দ্বীপকে হেফাজতে নিল পিবিআই সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ আসছে শনিবার বরগুনার ডাকবাংলোর ৩ মরদেহ উদ্ধার: চাঞ্চল্যকর রহস্য উদ্ঘাটন ৫০ গজ দূর থেকে বাইক উদ্ধার, বন্ধু দ্বীপকে জেরা করছে পিবিআই স্পিন ঘূর্ণিতে ক্যারিবীয়দের গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের লিড, রেকর্ড নাঈমের ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: বিপুল ভোটে জয়ী বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ১৪ বছর পর পর্দায় ফিরেই তোলপাড়, দেব-শুভশ্রীর রসায়নে নতুন গুঞ্জন টলিপাড়ায়

১০ থেকে ২০ মিলিগ্রামেই জীবন শেষ

বাংলাদেশে নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে প্যারাকোয়াট


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১২:৩৮ পিএম

কৃষিতে ক্ষতিকর আগাছানাশক হিসেবে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ‘প্যারাকোয়াট’ বর্তমানে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ায় যেখানে মাত্র একটি মৃত্যুর নথিভুক্ত রেকর্ড পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালে এসে একই রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে।

 

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গত জুলাই মাসে ভর্তি হওয়া ১১৭ জন বিষক্রিয়ার রোগীর মধ্যে সিংহভাগই এই বিষাক্ত আগাছানাশক পান করেছিলেন বলে জানা গেছে। চিকিৎসকেরা জানান, দেশে আত্মহত্যার বিপজ্জনক উপকরণ হিসেবে এই রাসায়নিকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এটি পানের পর তাৎক্ষণিক মৃত্যু না হয়ে রোগীর ফুসফুস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে এক যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু ঘটে।

 

আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিশেষ গবেষণায় বিষয়টির ভয়াবহতা উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরা যৌথভাবে এই গবেষণায় অংশ নেন।

 

২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১০টি প্রধান হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা মোট ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করেছেন। তথ্য অনুযায়ী, রাসায়নিকটির আমদানি ২০১৩ সালের ৫৩ টন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে গিয়ে পৌঁছেছে। কৃষিতে শ্রমিকের সংকট ও পারিশ্রমিক বাড়ায় এটি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও ইতিমধ্যে বিশ্বের ৭৭টিরও বেশি দেশে এই রাসায়নিক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট পানের ফলেও মানবদেহের ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পালমোনারি ফাইব্রোসিস বলা হয়। এতে সপ্তাহজুড়ে ধুঁকে ধুঁকে রোগীর মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে তীব্র কিডনি বৈকল্য, অবিরাম বমি ও প্রচণ্ড পেটে ব্যথা। ২০২৪ সালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনার মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশেরই করুণ মৃত্যু হয়েছে। টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের (টিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক মো. আবুল ফয়েজ এই ক্ষতিকর কীটনাশকটি দ্রুত নিষিদ্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন। গবেষণা অনুযায়ী, বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, যাদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ গৃহিণী।

 

বিষয়টি নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন যে, শুধু প্যারাকোয়াট নয়, এ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতি নিরূপণে গবেষকদের একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে এবং কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এটি নিষিদ্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশ্বজুড়ে এই বিষের ক্ষতির মাত্রা সর্বজনবিদিত। ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত এটি নিষিদ্ধ করে। অস্ট্রেলিয়ায় এর ব্যবহারের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে, কারণ বিজ্ঞানীরা দেখেছেন প্যারাকোয়াটের সংস্পর্শে এলে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। বিএমইউ-এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী সতর্ক করে জানান, মানবদেহে স্নায়ুতন্ত্রের পারকিনসন্স ডিজিজ ও ক্যানসারের প্রধান কারণগুলোর একটি এটি। তদুপরি এই বিষের সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক নেই।

 

ইতিপূর্বে দক্ষিণ কোরিয়া ২০০৬ সালে এটি নিষিদ্ধ করার পর সেখানে কীটনাশক পানে আত্মহত্যার হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। বাংলাদেশেও ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ক্লাস-১ ভুক্ত কীটনাশক নিষিদ্ধ করায় আত্মহত্যার হার কমেছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গোপাল দাশের নেতৃত্বে নিবন্ধিত ৩৪৩টি রাসায়নিকের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকির যে ২৫টি কীটনাশক চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে প্যারাকোয়াটকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

একসময় কেবল চা-বাগানে ব্যবহার হলেও এখন পাহাড়ি অঞ্চলের জুমখেত থেকে শুরু করে সমতলের কৃষিতে এর মারাত্মক অপব্যবহার হচ্ছে। বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রমিজ উদ্দিন জানান, যান্ত্রিক আগাছা দমন কিংবা ইমাজাপাইর ও ডিকাম্বার মতো কম বিষাক্ত বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অসাধু কোম্পানিগুলো অপরিকল্পিতভাবে এই প্রাণঘাতী বিষ আমদানি করে মানবজাতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর