ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ অপহৃত কালাতের রাজপুত্র শাহজাদা আহমেদজাই 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দ নিষিদ্ধের ঘোষণা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী পরীক্ষকের সামনে পুরুষরা কম ব্যথা অনুভব করেন: নতুন গবেষণা উইন্ডিজের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক! কাঁদুনে গ্যাসে ফরাসি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ, দাবি বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ফেনারবাখচেকে হারিয়ে ইউরোলিগে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত জয়

গাজীপুর আদালতে এক বিচারপ্রার্থীর অভিজ্ঞতা: আইনি পেশার মর্যাদা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১:৫৬ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক আকাশ জমিন

আইনজীবী পেশাকে বলা হয় এক মহৎ ও সম্মানিত পেশা। উপমহাদেশের কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা এই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা আইনজীবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখেন। কিন্তু একজন আইনজীবী যদি আদালতের পবিত্রতার বাইরে গিয়ে বিপরীত পক্ষের বিচারপ্রার্থীকে প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দেন এবং আদালতে ভুয়া নথিপত্র দাখিল করেন, তবে সেই পেশার মর্যাদা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।


আমি একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, হৃদরোগে আক্রান্ত প্রবীণ নাগরিক এবং নিয়মিত দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ গাজীপুর জেলার সাবেক সহ-সভাপতির সাথে গাজীপুর আদালতে জমিজমা সংক্রান্ত ১৪৫ ধারার একটি মামলা চলছে। উক্ত মামলায় বিবাদী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট এনামুল হক। 


২০২৩ সালে আমার বিরুদ্ধে একটি জালিয়াতির মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়, যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। উক্ত মামলায় আমি মহামান্য হাইকোর্ট থেকে নিয়ম অনুযায়ী আগাম জামিন গ্রহণ করি এবং ২০২৩ সালের ৩ মে গাজীপুর আদালতে যথারীতি হাজির হই। এর পরের একটি ধার্য তারিখে বিবাদী আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। ঐ দিন অত্যন্ত অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ওয়ারেন্ট এড়াতে আমি স্ত্রীসহ আদালতে উপস্থিত হই। 

গাজীপুর ও সংলগ্ন এলাকায় পারিবারিক অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হওয়া দুটি পৃথক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে দায়ের করা প্রথম সিআর মামলাটির (মামলা নম্বর: ৭১/২০২৩) বাদী হাসনাহেনা বেলী।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় মামলাটিতে (পিটিশন মামলা নম্বর: ৫৮৪/২০২২) আসামি করা হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের গাজীপুর জেলা কমিটির সহ-সভাপতি রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনিকে। উক্ত মামলার বাদী হিসেবে নাম রয়েছে আব্দুল কাইয়ুম খানের।


কিন্তু বিবাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এনামুল হক বিজ্ঞ আদালতে দাঁড়িয়ে মিথ্যা দাবি করেন যে, আমি নাকি ঢাকা থেকে আদালতে আসিনি এবং আগের দিন বিবাদীর বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছি। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি বাড্ডা থানার একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি আদালতে জমা দেন। বিজ্ঞ আদালত তদন্তের সুযোগ না দিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে আমার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে অনুসন্ধানে প্রকাশ পায় যে, জিডিতে তারিখ দেওয়া ছিল ২ মে ২০২৩, অথচ ঘটনার তারিখ দেখানো হয়েছে ২৯ এপ্রিল ২০২৪! অর্থাৎ ঘটনার এক বছর আগেই জিডি করা হয়েছে। বাড্ডা থানায় যোগাযোগ করে জানা যায়, উক্ত নম্বরে কোনো জিডির অস্তিত্বই নেই।


মিথ্যা ও জাল নথির ভিত্তিতে আমাকে গাজীপুর জেলা কারাগারে ৮ দিন বন্দি থাকতে হয়। কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমি গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের শিকার হই। পরবর্তীতে আদালতের আদেশে মুক্তি পেয়ে আমাকে ভারতের ব্যাঙ্গালোরের দেবী শেঠি হাসপাতালে জটিল বাইপাস সার্জারি করাতে হয়। আমার হার্টে ৬টি ব্লক ধরা পড়ে। পরবর্তীতে অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমার জামিন মঞ্জুর করে আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ করেন, হাইকোর্টের জামিন যেভাবে বাতিল করা হয়েছে তা মোটেও আইনসম্মত ছিল না।


শুধু আদালতেই নয়, আদালতের বাইরেও উক্ত আইনজীবীর আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একাধিক দিন আদালত ভবন থেকে বের হওয়ার সময় তিনি আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ও গাড়ি ভাঙচুরের হুমকি দিয়েছেন। একজন অসুস্থ, প্রবীণ সাবেক সরকারি কর্মকর্তার প্রতি আইনজীবী নামধারী ব্যক্তির এমন আচরণ কোনো সভ্য সমাজ বা পেশাদার আইনজীবীর হতে পারে না।


উক্ত ১৪৫ ধারা মামলায় আরও নানা অনিয়ম দৃশ্যমান। বিবাদী রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনি যখন একটি ফৌজদারি মামলায় গাজীপুর জেলা কারাগারে ছিলেন, তখনও রহস্যজনকভাবে তাকে আদালতে উপস্থিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিগত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে তিনি আদালতে সশরীরে না আসা সত্ত্বেও তার আইনজীবী বিভিন্ন অজুহাতে সময় প্রার্থনা করছেন এবং আদালত তা মঞ্জুর করছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে আদালতের ওয়ারেন্টের নথি জমা দেওয়া হলেও কোনো কার্যকরের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।


এছাড়াও, আমার দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে নেশাগ্রস্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১০৭ ও ১১৭ ধারার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে মুচলেকা দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বিজ্ঞ আইনজীবীর প্রভাবে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনরায় এই দেওয়ানি মামলায় নতুন করে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আইনের সাধারণ রীতির বিরোধী।


যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির সুপ্রিম কোর্টে আমার ছেলের একটি ভুলবশত মামলার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, সেখানে বিচারক ও সরকারি আইনজীবীরা কতটা মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ। সাধারণ একটি ভুলের জন্য বিচারক ধৈর্য ধরে কথা শুনেছেন এবং সম্মানজনক সমাধান দিয়েছেন। অথচ আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষকে পদে পদে হয়রানি ও জালিয়াতির মুখোমুখি হতে হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতিতে বিচার ব্যবস্থার অবস্থান অন্যতম শীর্ষে থাকা অত্যন্ত লজ্জাজনক।


একজন আইনজীবী তার মক্কেলের পক্ষে আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন, এটিই স্বাভাবিক এবং আইনসম্মত পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু বিবাদীকে জেতানোর উদ্দেশ্যে আদালতে ভুয়া জিডি দাখিল করা, বিপক্ষ বিচারপ্রার্থীকে আদালতের আঙিনায় হুমকি দেওয়া কিংবা অন্য পক্ষের আইনজীবীদের প্রভাবিত করা কোনো পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আইনজীবী পেশার গৌরব পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।


গাজীপুর আদালত প্রাঙ্গণে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মুখোমুখি হয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম খান নামে এক বিচারপ্রার্থী। স্থানীয় এডভোকেট এনামুল হকের নানামুখী ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকির মুখে বর্তমানে তিনি গাজীপুর আদালতে যেতে ভয় পাচ্ছেন এবং গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, এডভোকেট এনামুল হকের পক্ষ থেকে আসা ভয়ভীতি ও বাধার কারণে তিনি আইনি সুরক্ষা পেতে আদালতে উপস্থিত হতে সাহস পাচ্ছেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশের পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও চরম উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম খান।

চাঁদাবাজিসহ একাধিক ফৌজদারি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত (ওয়ারেন্ট) আসামি হওয়া সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মামলাগুলোর প্রধান বিবাদী রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনি। একাধিক মামলার পরোয়ানা থাকলেও অজানা ও অদৃশ্য কারণে তাকে গ্রেফতার করছে না স্থানীয় কালিয়াগঞ্জ থানা পুলিশ—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পুলিশের তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার কথা থাকলেও, রহস্যজনক কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করা থেকে বিরত রয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থানীয় সচেতন মহল ও ক্ষুব্ধ বিচারপ্রার্থীরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে অবিলম্বে এই ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তাঁরা।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর