ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬,  ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২০ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে বগুড়ার ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিতের প্রত্যয় তিন মন্ত্রীর আ.লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দাফন হয়েছে: সালাহউদ্দিন আহমদ মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা রবিবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন তারেক রহমান রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কেনায় ভারত-চীনের ওপর ১০০% শুল্কের মার্কিন বিল পাস রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কিনলেই ১০০% শুল্ক: মার্কিন সিনেটে বিল পাস ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সমাবেশে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

শিক্ষায় আশঙ্কাজনক উল্টো স্রোত:

এইচএসসির আগেই ঝরে পড়ল সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৮ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:৪৭ এএম

দেশের শিক্ষাখাতে অর্জিত ধারাবাহিক সফলতা ও ধারাবাহিক অগ্রগতিতে হঠাৎই শুরু হয়েছে নেতিবাচক প্রভাব। বেশ কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রটি একেবারে বিপরীত মুখ ধারণ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ উপাত্ত ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ২০২৪ সালের পর থেকে সবকটি ধারার শিক্ষাব্যবস্থাতেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া বা ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক ধাক্কা এসেছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়; যেখানে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার আগেই কেবল একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যানের বিস্তারিত চিত্রে দেখা যায়, ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর। তবে পরীক্ষার প্রথম দিনেই অনুপস্থিত থেকেছেন ২৪ হাজার ৭৮৪ জন শিক্ষার্থী। এর চেয়েও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ফরম পূরণের ক্ষেত্রে। একাদশ শ্রেণিতে যথারীতি ভর্তি ও অনলাইন নিবন্ধন সম্পন্ন করলেও সাড়ে পাঁচ লাখের মতো শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে আর ফরম পূরণ করেননি। ফলে কোনো পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই তারা ঝরে পড়ার মিছিলে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধান করলে এই পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন বা নাম নিবন্ধিত করেছিলেন ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে চূড়ান্তভাবে ফরম পূরণ করেন ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ কেবল সাধারণ বোর্ডগুলোতেই ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩.০৪ শতাংশ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষার বাইরে চলে গিয়েছেন। অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন নিবন্ধনের পর ফরম পূরণ করেছেন ৭৮ হাজার ২৬৯ জন, যেখানে ঝরে পড়ার হার দাঁড়ায় ৪৪.০৭ শতাংশে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরিস্থিতি ছিল সবচাইতে করুণ; ভোকেশনাল শাখায় নিবন্ধন করা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন ফরম পূরণ করেন। ফলে দেশের কারিগরি শিক্ষায় ঝরে পড়ার সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে ৫৪.৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছেন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ২ জুলাই আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নিজের গভীর উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ঐতিহাসিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার পরবর্তী ধাপে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে দেখা গেলেও এবার সাধারণ ধারায় ৩৩, মাদ্রাসায় ৪৪ এবং কারিগরি শাখায় প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি কিংবা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া সরকারের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম দিনের এইচএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা ২৪ হাজার ৭৮৪ জনের মধ্যে সাধারণ বোর্ডে ১৭ হাজার ২৩৩, মাদ্রাসায় ৪ হাজার ৪৭৮ এবং কারিগরিতে ৩ হাজার ৭৩ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪-এর ডেটা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অনুপাত ছিল ১৩.১৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে একলাফে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬.২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ১৯.০২ শতাংশ, যা মেয়েদের (১৩.৩৬ শতাংশ) চেয়ে অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুসারে, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার অনুপাত সব স্তরের মধ্যে সর্বাধিক—প্রায় ৩২.৮৫ শতাংশ। তবে প্রাথমিক স্তরের বিপরীত চিত্র দেখা যায় মাধ্যমিকে, যেখানে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ৩০.৬৩ শতাংশের বিপরীতে মেয়েদের হার ৩৪.৮৭ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সামগ্রিক ঝরে পড়ার হার ২১.৫১ শতাংশ এবং ডিপ্লোমা শ্রেণিতে ৬.৩৪ শতাংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জলবায়ুজনিত সংকটের সরাসরি বলি হয়ে সারা দেশে ১ লাখ ২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছেন, যার মধ্যে ৬১.০৮ শতাংশই (৬২,৩০৮ জন) ছাত্রী।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা গবেষকরা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মূল পেছনে বেশ কয়েকটি আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত কারণকে চিহ্নিত করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য, পরিবারের আকস্মিক আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহের প্রবণতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত, শিক্ষায় ক্রমাগত ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং অভিভাবকদের অনীহা শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিকে দারিদ্র্যের কারণে ছেলেরা উপার্জনের আশায় শিশুশ্রমে যুক্ত হলেও মাধ্যমিকে সামাজিক অনিশ্চয়তা ও বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এই বিষয়ে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিতিশীলতা ও মব-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল, তা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অটোপাস চাওয়ার প্রবণতা কিংবা শ্রেণি কার্যক্রমে অনিয়মিত হওয়ার মানসিকতা শিক্ষার শিখন-ক্ষতি বাড়িয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া অবৈতনিক শিক্ষার অভাব ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই শেষপর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক শেষ করতে পারছে না। ফলে তিনি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তির পরিধি সম্প্রসারণের সুপারিশ করেন। শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক যোগ করেন যে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার গ্রাম বা শহরের উপান্তে স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেকে কোচিং বা পরীক্ষার বাড়তি খরচ জোগাতে না পেরে পড়াশোনা স্থগিত করেছেন।

শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে এবং এই উদ্বেগজনক ধারা রোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিশ্চিত করেছেন যে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া থামাতে উপবৃত্তি বিতরণ, নতুন চার রঙের বই প্রদান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বিস্তৃতকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করে খোঁজ নেওয়ার কাজ বেগবান করা হচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর