অধ্যাপক ড. মোঃ গোলাম ছারোয়ার
অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও শিক্ষাগত গুরুত্বের বিচারে বগুড়া বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জেলার একটি বড় শূন্যতা দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষানগরী হওয়া সত্ত্বেও একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় হাজারো শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য জেলায় পাড়ি জমাতে হয়েছে। এ বাস্তবতা কেবল একটি অবকাঠামোগত ঘাটতিই নয়, বরং অঞ্চলের সামগ্রিক জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের পথেও একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৮১ সালের ১ আগস্ট বগুড়া পৌরসভা 'ক' শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৩.৭৩৪ মিলিয়ন জনসংখ্যাসমৃদ্ধ ৩ হাজার বর্গকিলোমিটারে বিস্তৃত এই ঐতিহ্যবাহী জেলার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে—শুধু হতবাকই নয়, স্তম্ভিত ও নির্বাক হয়েছি। বিগত ১৭ বছরে অন্যান্য জেলার দৃশ্যমান উন্নয়ন হলেও তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি এই প্রাচীন ঐতিহ্যের লীলাভূমিতে।
প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচারের আধার এই বগুড়া শহর ও পুরো জেলা অবহেলার চাদরে ঢাকা পড়েছে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বিগত পতিত সরকারের আমলে। চরম বৈষম্য আর অবহেলার শিকার হয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদের মানুষ। বগুড়ার ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ছিল সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। কেন এ চরম বৈষম্য—উত্তরও অতি সহজ। তা হলো, এই পুণ্যভূমিতে জন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের; এই পুণ্যভূমির মানুষের আপনজন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের নেত্রী, গণতন্ত্রের আপোসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের তিন তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রিয় ভূমি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, সারা বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বের আইকন জনাব তারেক রহমানের জন্মভূমি। শুধু এই কারণগুলোই বগুড়ার সমস্ত উন্নয়নকে বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ করে বঞ্চিত করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।
বিগত সময়ে দেশের সমতাভিত্তিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাঁর প্রিয় সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁদের সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র, বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সুপরামর্শে বগুড়া জেলাকে এবং বগুড়াসহ সারা দেশকে যে অবস্থানে নিয়েছিলেন—সেই অবস্থান হতে বিগত ১৭ বছরে বগুড়াবাসী যোজন যোজন দূরত্বে ছিটকে পড়েছিল।
শুধু যে বগুড়া এলাকার ভৌগোলিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে তা নয়, বঞ্চিত হয়েছে বহু উচ্চশিক্ষিত যুবক তাদের প্রাপ্য যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবি পাওয়া থেকে। সকল যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়েও তারা বাদ পড়েছেন, কারণ তাদের একমাত্র অযোগ্যতা ছিল বাড়ি বগুড়া জেলায়।
বগুড়া হলো উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, যা শিল্প, সাহিত্য ও কৃষ্টি-কালচারের লালনভূমি। রাজধানী ঢাকার সাথে রেল যোগাযোগে সিরাজগঞ্জ হতে বগুড়া পর্যন্ত মাত্র ৮৪ কিলোমিটার প্রস্তাবিত ডুয়েলগেজ রেলপথ। এই রেলপথ নির্মিত হলে সরাসরি বগুড়া হতে সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকায় অতি অল্প সময়ে পৌঁছানো যাবে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত আরাধনা এখন বাস্তবায়নের পথে। এটা বঞ্চিত মানুষের আকাঙ্ক্ষা, যা শুধু বগুড়াবাসীর নয়, বগুড়াসহ সারা উত্তরবঙ্গের। এটাই সুষম উন্নয়ন—মোটেও পক্ষপাত নয়।
বগুড়াবাসীর প্রত্যাশার আকাশে বিমানের উড্ডয়ন এখন বাস্তবায়নের পথে গতি পেয়েছে। সাম্যের বাতাসে উদ্ভাসিত হয়েছে সারা উত্তরবঙ্গসহ পুরো দেশ। তাই তো ইহা পক্ষপাতদৃষ্টিকে পরাজিত করে সাম্যতার উন্নয়নে স্থিত হয়েছে। বগুড়াবাসীসহ সারা দেশের মানুষের ভাগ্যে অর্থনৈতিক নানামুখী উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের পুরোনো পৌরসভা রূপান্তরিত হয়েছে মর্যাদাশীল সিটি করপোরেশনে। ফলশ্রুততে বঞ্চিত বগুড়াবাসী পেতে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত মানের জীবনযাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য সুবিধাদি। প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বগুড়া মেট্রোপলিটন পুলিশসহ নির্মিত হতে যাচ্ছে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের অবকাঠামো। অবহেলায় পড়ে থাকা বিরান ভূমিতে পরিণত হওয়া আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম 'শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম' ফিরে পেতে যাচ্ছে তার প্রারম্ভিক জৌলুস।
গত ১৩ এপ্রিল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্টেডিয়ামটি পরিদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামটি চালুর বিষয়টি এখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়েছেন। আইসিসির স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী আন্তর্জাতিক একটি স্টেডিয়ামের যে সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার, সেই আদলে এটিকে পুনর্গঠন করার জন্যই তিনি এসেছিলেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, মন্ত্রণালয় এবং ক্রিকেট বোর্ড সবাই একমত হওয়ায় শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করা হবে। ২০০৬ সালের পর এখানে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। এই স্টেডিয়ামটি যদি যথাযথভাবে চালু হয়, তবে বগুড়াবাসীর বিশ্বপরিমণ্ডলে বিচরণ, যোগাযোগ এবং প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারিত হবে অতি সহজেই। আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদসহ সকল পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বগুড়াবাসীর তথা সারা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে ইনশাআল্লাহ। বিভিন্ন দেশের কৃষ্টি-কালচারের আদান-প্রদানেও এটি রাখবে অসামান্য অবদান।
আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ছাড়াও এই অর্থবছরে বগুড়াসহ ৮টি বিভাগ, ফরিদপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলে স্পোর্টস ভিলেজের কাজ শুরু হবে। এই স্পোর্টস ভিলেজগুলো আন্তর্জাতিক মানের হবে। সেখানে ফুটবল, ক্রিকেট, আর্চারি, সুইমিং, শুটিংসহ সকল ধরনের খেলার ব্যবস্থা থাকবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থলে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছে, যা এখন বাস্তবায়নের পথে। আগে থেকেই একটি বিশেষায়িত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা থাকলেও জেলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং উচ্চশিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছে। বগুড়াবাসীর এই স্বপ্ন পূরণ করছেন এই জেলারই সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দীর্ঘদিন বঞ্চিত বগুড়ার এই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় মুখ্য সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি প্রায়ই এলাকাবাসীর কাছে গিয়ে তাদের সমস্যা ও চাহিদা সরাসরি শোনার চেষ্টা করেন, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।
সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া বগুড়া জেলাকে দেশের অন্যান্য জেলার সমপর্যায়ে নিয়ে আসার এই প্রচেষ্টা পক্ষপাতদুষ্ট উন্নয়ন নয়, বরং সমতাভিত্তিক উন্নয়ন-চিন্তারই প্রতিফলন। বগুড়া বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকা নয়—এই জেলার উন্নয়নের সুফল শুধু বগুড়াবাসীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। অব্যাহত থাকুক বগুড়াসহ সারা দেশের উন্নয়নের এই ধারা। সমৃদ্ধশালী হোক বাংলাদেশ।
বগুড়ার উন্নয়ন কেবল বগুড়াবাসীর জন্যই নয়—এর সুফল ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। প্রাচীন এই জনপদ যেন তার প্রাপ্য মর্যাদা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে—এটাই স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা।
অধ্যাপক
ও বিভাগীয় প্রধান
কীটতত্ত্ব-বিভাগ
জাতীয়
প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা
প্রতিষ্ঠান, নিপসম সহাখালী ঢাকা