ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬,  ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২০ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে বগুড়ার ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিতের প্রত্যয় তিন মন্ত্রীর আ.লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দাফন হয়েছে: সালাহউদ্দিন আহমদ মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা মতিঝিল ও সাভারে আইইডি উদ্ধারে বিদেশি অর্থায়নের ছায়া, সন্ধানে গোয়েন্দারা রবিবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন তারেক রহমান রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কেনায় ভারত-চীনের ওপর ১০০% শুল্কের মার্কিন বিল পাস রেকর্ড উচ্চতায় সোনার দাম: ভরিতে বাড়ল ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা রাশিয়ার তেল কিনলেই ১০০% শুল্ক: মার্কিন সিনেটে বিল পাস ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সমাবেশে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তৃণমূলের উন্নয়ন গিলে খাচ্ছে ‘পিআইও সিন্ডিকেট’: দুর্নীতির জাল ছিঁড়বে কীভাবে?


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৭:০৪ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি: আব্দুল কাইয়ুম খান  

বাংলাদেশ সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সিংহভাগ বাজেটই বরাদ্দ থাকে উপজেলা পর্যায়ে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট গ্রামীণ উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ বাস্তবায়িত হয় এসব প্রান্তিক প্রশাসনিক ইউনিটে। আর এই বিশাল অর্থের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও সরাসরি বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)।

গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), সাধারণ ত্রাণ (জিআর), কাজের বদলে ভিজিএফ ও ভিজিডি খাদ্য সহায়তা, আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং ধর্মীয়-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বরাদ্দসহ গ্রামীণ রাস্তা, কালভার্ট ও সেতু নির্মাণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই এ পদের মূল দায়িত্ব। তবে চরম বাস্তবতায় আশার আলো জাগানো এসব সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পই এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। গত এক দশকের গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা গেছে, গ্রামীণ উন্নয়নের মূল স্তম্ভ পিআইও অফিসগুলো যেন এখন দুর্নীতির অবাধ “হটস্পট”।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পিআইও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে উঠা শত কোটি টাকার অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের অধিকাংশ উপজেলায় এটি এখন যেন নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্র। মাঠপর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের ত্রিভুজ আঁতাত তৃণমূলের সার্বিক উন্নয়নকে একেবারে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

দুর্নীতির বহুমাত্রিক কৌশল ও প্রয়োগক্ষেত্র

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে প্রধানত তিনটি ভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে:

১. আর্থিক কারসাজি ও হরিলুট:

প্রাক্কলন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন: কোনো গ্রামীণ সড়ক বা প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় ১ কোটি টাকা হলেও তা প্রাক্কলনে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেখিয়ে সরকারি টেন্ডার অনুমোদন করানো হয়। অতিরিক্ত অর্থ ভাগাভাগি হয়ে যায় চক্রের মধ্যে।

ভুয়া বিল-ভাউচারের ব্যবহার: বাস্তবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ শেষ না হতেই শতভাগ কাজের কাগজ তৈরি করে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়। ঠিকাদারদের সাথে গোপন আঁতাতে নকল রসিদ ও পরিমাপ বই (এমবি) বানিয়ে অর্থ আত্মসাৎ নিত্যদিনের চর্চা।

উৎকোচ ও কমিশন বাণিজ্য: প্রতিটি বিল মঞ্জুরের পূর্বশর্ত হিসেবে ১০ থেকে ২০ শতাংশ নগদ অর্থ ঘুষ দিতে হয়। দাপ্তরিক পরিভাষায় এই অনৈতিক লেনদেনকে ডাকা হয় “চা-নাস্তার খরচ” নামে। কমিশন না দিলে ফাইল মাসের পর মাস লাল ফিতায় আটকে রাখা হয়।

২. নিম্নমানের কাজ ও ভুয়া সমাপ্তি: সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ভালোমানের সিমেন্ট, রড ও পিচ ব্যবহারের নির্দেশনা ও বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মাঠে ব্যবহার করা হয় মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিকৃষ্টমানের সামগ্রী। ফলে যে রাস্তা কমপক্ষে ৫ বছর টেকসই হওয়ার কথা, তা নির্মাণের পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই খানাখন্দে পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গ্রামে কাজ না করে অন্য এলাকায় নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে পুরো বাজেট তুলে নেওয়া হয়। আবার বর্ষা মৌসুমে অসম্পূর্ণ কাজের জন্য শতভাগ বিল উত্তোলন করে পরের অর্থবছরে সেখানে আবার নতুন প্রকল্প এনে পুনরায় অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।

৩. টেন্ডার ও নিয়োগের সিন্ডিকেট: উপজেলাপর্যায়ে ৩ থেকে ৪ জন পছন্দের ও অনুগত ঠিকাদার নিয়ে বলয় তৈরি করা হয়। নিরপেক্ষ কোনো ঠিকাদার অংশগ্রহণ করতে চাইলে হয় ভীতি প্রদর্শন করা হয়, নতুবা টেন্ডারের শর্তাবলী এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বাইরে থেকে কেউ যোগ্য বলে বিবেচিত না হতে পারেন।

দুর্নীতির সর্বগ্রাসী ইকোসিস্টেম

এই হরিলুট কোনো একক পিআইও-এর পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এটি একটি সুসংগঠিত ও জটপাকানো ইকোসিস্টেম বা অপরাধ চক্র:স্তর

বা পদবীচক্রে ভূমিকা ও প্রভাব
পিআইওচেইন বা চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক। প্রকল্প তালিকা, পরিমাপ ও পরিদর্শনের ফাইল প্রস্তুত করেন।
ইউএনও ও ডিআরআরওপ্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ফাইলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। অভিযোগ রয়েছে, বড় অংশের কমিশন তাদের দরবারেও পৌঁছে যায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এমপিঠিকাদার নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখেন। "এমপির লোক" তকমা ছাড়া কোনো সাধারণ ঠিকাদার কাজ পায় না।
পছন্দের ঠিকাদারআগাম কমিশন দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয় এবং কাজ শেষ না করেই সিংহভাগ লাভের অংশ চক্রকে বুঝিয়ে দেয়।

এই অপরাধচক্রের কারণে সাধারণ মানুষের নিরপেক্ষ অভিযোগের সুযোগ স্তব্ধ হয়ে যায়, কারণ কোনো অভিযোগ উঠলেই ওপর থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়।

মাঠপর্যায়ের সাম্প্রতিক চিত্রে ভয়াবহ বাস্তবতা

দুদক ও স্থানীয় সূত্রমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা হওয়া মোট অভিযোগের প্রায় ২৩ শতাংশই ছিল উপজেলাপর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প কেন্দ্রিক।

মিঠাপুকুরের ঘটনা: রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পিআইও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে গ্রামীণ সড়ক, স্কুল ও ত্রাণ প্রকল্পে ব্যাপক লুটপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, অন্তত ১৫ শতাংশ কমিশন না দিলে সেখানে কোনো প্রকল্পের চেক ইস্যু হতো না।

সড়ক ও জনপথের অনিয়ম: শুধু পিআইও অফিসই নয়, সমান্তরালভাবে বিভিন্ন দপ্তরেও লেগেছে দুর্নীতির ছোঁয়া। সম্প্রতি সড়ক ও জনপথের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাক্কলন বাড়িয়ে ১৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি এবং ফাইল প্রতি ৫-৮ শতাংশ কমিশন নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকের নজরে এসেছে।

রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে ধ্বংসাত্মক প্রভাব

এই অনিয়মের ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় ঘটছে। এর প্রত্যক্ষ বলি হচ্ছেন সাধারণ গ্রামবাসী। নিম্নমানের কালভার্ট ভেঙে পড়ায় বা অসমাপ্ত সড়কের জন্য বর্ষায় লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা একবারে তছনছ হয়ে যাচ্ছে।

উত্তরণের পথ: প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা

উপজেলা পর্যায়ে পিআইও কেন্দ্রিক এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

জরুরি ভিত্তিতে করণীয় (স্বল্পমেয়াদি):

১. ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত তথ্য: প্রতিটি উপজেলার বরাদ্দকৃত প্রকল্পের নাম, অর্থছাড়, নির্ধারিত ঠিকাদারের নাম ও বাস্তবায়নকালীন কাজের ভিডিওচিত্র উপজেলা ও জেলা তথ্যবাতায়নে নিয়মিত প্রকাশ করা।

২. হটলাইন ১০৬ ও পুরষ্কার ব্যবস্থা: তথ্যপ্রমাণসহ দুর্নীতি বা ঘুষ দাবির ঘটনা অ্যান্টি-করাপশন হটলাইনে জানালে অভিযোগকারীকে বাজেটের ১০ শতাংশ পুরষ্কার দেওয়ার আইনি বিধান প্রবর্তন করা।

৩. নিয়মিত বদলি ও ট্র্যাকিং: কোনো পিআইও বা প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দিষ্ট এক উপজেলায় দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়া।

স্থায়ী পরিবর্তন ও সংস্কার (দীর্ঘমেয়াদি):

১. থার্ড-পার্টি স্বাধীন অডিট: প্রকল্প পরিদর্শন ও বিল পাসের দায়িত্ব সরকারি প্রকৌশলীদের হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে নিবন্ধিত নিরপেক্ষ কোনো তৃতীয় পক্ষ বা প্রকৌশল সংস্থাকে দিয়ে মান যাচাই বাধ্যতামূলক করা।

২. সম্পদের হিসাব প্রকাশ: পিআইও এবং তাঁদের পরিবারবর্গের বাৎসরিক সম্পদের হিসাব অনলাইনে সার্বজনীন যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।

৩. কঠোর ফৌজদারি শাস্তি ও বাজেয়াপ্তকরণ: অনিয়ম প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি অর্জিত বেআইনি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও অন্তত ১৪ বছরের কারাদণ্ড সুনির্দিষ্ট করা। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা এমপি সুপারিশ বা অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা করলে তাঁকেও সমান অপরাধে দণ্ড দেওয়া।

৪. নাগরিক পর্যবেক্ষণ কমিটি: স্থানীয় ৫ জন সম্মানিত ও নিরপেক্ষ সাধারণ নাগরিকের সমন্বয়ে সামাজিক পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা, যাদের সই বা সম্মতিপত্র ছাড়া কোনো প্রকল্পের বিল ছাড় করা যাবে না।

তৃণমূলের উন্নয়ন অবকাঠামো তখনই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণে আসবে, যখন প্রকল্পের একটি পয়সাও কোনো অসৎ কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের পকেটে যাবে না। পিআইও অফিসকেন্দ্রিক এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বন্ধ করা কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কঠোর আইনি প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদারকি ব্যবস্থা ও নাগরিক সচেতনতা একীভূত করতে পারলে তবেই তৃণমূলের প্রতিটি সরকারি টোকেনের সুফল শতভাগ ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর