চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে মারাত্মক গ্যাস লিকেজের ঘটনায় দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন শিল্প সচিবসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। শনিবার সকালে জাহাজটি পরিদর্শনের সময় ভেতরে অত্যন্ত বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিপজ্জনক উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। পরিদর্শকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সূচনাকালে জাহাজের ভেতরে এই গ্যাসের ঘনত্ব ১০০ পিপিএমের (পার্টস পার মিলিয়ন) চেয়েও বেশি ছিল। এত বেশি তীব্র ঘনত্বের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হলে মাত্র এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্তব্ধ হয়ে শ্রমিকদের করুণ মৃত্যু ঘটতে পারে।
দুর্ঘটনার পরদিন শনিবার সকালে সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শিল্প সচিব আবদুন নাসের খানসহ শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নেতারা এবং বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডির পর থেকেই পুরো ইয়ার্ড এলাকাটি ঘিরে রেখেছে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সদস্যরা। নিরাপত্তাঝুঁকি থাকায় দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে উদ্ধার ও তদারকির কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।
পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে, মারাত্মক দুর্ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পার হওয়ার পরও জাহাজের অভ্যন্তরীণ প্রকোষ্ঠে ১০ দশমিক ৮ পিপিএম বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের শক্তিশালী অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ফলে এর ওপর ভিত্তি করেই বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, দুর্ঘটনার প্রথম মুহূর্তে গ্যাসটির মাত্রা ১০০ পিপিএম ছড়িয়ে গিয়েছিল, যা শ্রমিকদের মাত্র কয়েক মিনিটে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেয়। বর্তমানে জাহাজ ও এর আশপাশের এলাকা সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করার বিশেষ বৈজ্ঞানিক কাজ শুরু করবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর।
অন্যদিকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধানে সরকারিভাবে একাধিক পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শিল্প সচিব আবদুন নাসের খান এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত এসব কমিটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখে দ্রুততম সময়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্তে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার গাফিলতি বা অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা।
তবে শিপইয়ার্ড মালিকদের প্রতিনিধি সংগঠন বিএসবিআরএর সভাপতি মো. মহসিন চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কোনো স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির পূর্বে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ প্রদানকারী সংস্থার কাছ থেকে সেটি সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত বা 'গ্যাস ফ্রি' থাকার প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলকভাবে নেওয়া হয়ে থাকে। দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির ক্ষেত্রেও সেই বৈধ আন্তর্জাতিক সনদ ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তা সত্ত্বেও কীভাবে জাহাজের ভেতরে প্রাণঘাতী বিষাক্ত গ্যাস থেকে গেল, তা গভীরভাবে তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনে ভুয়া বা ত্রুটিপূর্ণ সনদ প্রদানকারী সেই আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, মর্মান্তিকভাবে নিহত ৯ জন শ্রমিকের মধ্যে ৮ জনের মরদেহ পরিবার ও স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সচল রয়েছে। একদিকে জাহাজে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গ্যাসমুক্ত সনদের দাবি—এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই এখন তদন্তের মূল বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা পুরো শিল্পখাতের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য এক চরম অশনিসংকেত।