সম্প্রতি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরের একটি মেট্রো রেল স্টেশনের নিচে হঠাৎ করে বোমা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই থমথমে খবর
পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযানে উপস্থিত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। পরবর্তীতে এলাকাটি পরীক্ষা করে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। তবে ঘটনার প্রেক্ষাপট কেবল একটি মেট্রো স্টেশনের আতঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশে নতুন করে জঙ্গিরা ছোট ছোট ‘সেল’ গঠনের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ সংস্থা
জাতিসংঘের একটি নিরাপত্তা প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে
আন্তর্জাতিক সংস্থার এ ধরনের উদ্বেগের
বিষয়ে বাংলাদেশের পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের কাছে এই সংক্রান্ত কোনো
সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণের উপস্থিতি
নেই। এমনকি পুলিশের বিশেষ শাখা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের শীর্ষ কর্মকর্তারাও আন্তর্জাতিক ওই সতর্কতার বিষয়ে
আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি না হলেও মাঠপর্যায়ের
বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। কারণ গত কয়েক সপ্তাহ
ধরেই রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের
বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক তাজা
বোমা এবং শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করছে পুলিশ। সেই প্রেক্ষাপটে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের সমস্ত সদস্যদের অত্যন্ত কঠোর ও সর্বোচ্চ সতর্কতা
বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারির পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক
এই সতর্কবার্তা এমন একসময়ে সামনে এলো, যখন দেশে নতুন করে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ দল এক বিশেষ
মূল্যায়নে জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার ভারতীয়
উপমহাদেশীয় শাখা ‘আল-কায়েদা ইন
দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ বা ‘একিউআইএস’ বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ছোট ছোট এবং অত্যন্ত গোপনীয় ‘সেল’ বা নেটওয়ার্ক গড়ে
তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জাতিসংঘ তাদের বিশদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার কোনো
স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেনি। কিংবা কোনো সক্রিয় বা কার্যকর সেলের
সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানও তারা চিহ্নিত করেনি। ফলে এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো বিপদের ঘোষণা নয়, বরং বাংলাদেশে উদীয়মান একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের ঝুঁকি
নিয়ে দেওয়া আগাম সতর্কতা বা ‘থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ বলেই মনে করছেন অপরাধ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সাধারণত
সামরিক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের
পরিভাষায় ‘সেল’ বলতে বোঝায় বড় কোনো একক
স্থায়ী ঘাঁটি বা বড় ইউনিটের
পরিবর্তে অত্যন্ত ছোট, বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
থাকা ‘স্লিপার সেল’ কিংবা আধুনিক গোপনীয় নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে গোপনে সদস্য সংগ্রহ ও আড়ালে কার্যক্রম
পরিচালনা করা হয়। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই একিউআইএস তাদের
লজিস্টিক সহায়তা এবং নিজস্ব আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার অসৎ উদ্দেশ্যে সেল গঠনের জন্য বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাত্র সাড়ে ৩ মাস আগে
সরকারের সর্বোচ্চ মহল ও মন্ত্রী পর্যায়
থেকে খুব স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতার অস্তিত্ব নেই। তবে এই মন্তব্যের পরপরই
গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একের পর এক তাজা
বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের
ঘটনা পুলিশকে বাধ্য করেছে আবারও মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জোরদার করতে। ফলে বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সমস্ত উগ্রবাদ ও জঙ্গিবিরোধী অভিযান
আরও জোরদার করার জন্য মাঠপর্যায়ে কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ
নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, একিউআইএস-কে তারা দক্ষিণ
এশিয়ার একটি দ্রুত বিকাশমান আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মূল্যায়ন বলে, এই সংস্থাটি আগের
যেকোনো সময়ের চেয়ে বিচ্ছিন্ন কাঠামো থেকে একটি বড় আঞ্চলিক রূপ
নেওয়ার চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের দিল্লির লালকেল্লায় সংঘটিত ভয়াবহ হামলার ঘটনার নেপথ্যেও এই একিউআইএস সংগঠনের
সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এরপরই
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দেশের ভূখণ্ডকে অপব্যবহার করে নতুন নতুন সেল গড়ে তোলার এই চেষ্টা বেশ
উদ্বেগজনক। কিন্তু সংস্থাটি নির্দিষ্ট করে কোনো ঘাঁটির পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা কিংবা তাদের কোনো বর্তমান সক্রিয় সেলের সদস্যসংখ্যা উল্লেখ করেনি। তাই তথ্যের সঠিক বিচারে এটিকে স্থায়ী ঘাঁটি বা আস্তানা না
বলে ‘সেল গড়ার চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উদ্বেগ’ হিসেবে দেখাটাই বাস্তবসম্মত।
অন্যদিকে
সরকারের গতদিনের বক্তব্যের সঙ্গে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের কিছু ফারাক বা গরমিল লক্ষ
করা যায়। গত ২৭ এপ্রিল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেছিলেন যে, ‘দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই’। তিনি মন্তব্য
করেছিলেন যে, অতীতে বহু সময় ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অবশ্য তা সত্ত্বেও অন্যান্য
দেশের মতো বাংলাদেশেও বিচ্ছিন্নভাবে উগ্র বা কট্টরপন্থী উপাদানের
উপস্থিতির আশঙ্কাকে তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিফলনেই
পরবর্তীতে সরকারি কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন
দেখা যায়।
গত
২৪ মে তিনি নিজে
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন এবং জঙ্গি মোকাবিলায় অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তি
নির্ভরতা নিশ্চিত করার ওপর জোর তাগিদ দেন। বর্তমানে এসব বিশেষ ইউনিটগুলোকে আরও শক্তিশালী করে সমন্বিত একটি ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’ (এসএসইউ) গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে চলমান রয়েছে।
জাতিসংঘের
এই উদ্বেগের বিষয়টিকে দেশের খ্যাতনামা মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ একবারে চিরতরে নির্মূল হয়ে গেছে—এমন ধারণা পোষণ করার কোনো অবকাশ নেই। তবে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবিরোধী অভিযান
পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও সম্পূর্ণ আইনি
প্রক্রিয়া বজায় রেখে কাজ করার পরম পরামর্শ দেন তিনি।
যাতে
প্রকৃত অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজনরা অভিযান
চলাকালে দেশের কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে নিজেদের ‘ভিকটিম’ বা ভুক্তভোগী হিসেবে
উপস্থাপন করার অন্যায্য সুযোগ না পেয়ে যায়।
তিনি অতীতে উদ্ধার অভিযানের কিছু প্রচলিত বর্ণনা, যেমন—বিস্ফোরকের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় লিফলেট বা পুস্তিকা উদ্ধারের
ধারাবাহিক বর্ণনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, কোনো অভিযানে বোমার সঙ্গে অবাস্তবভাবে শ শ লিফলেট
পাওয়ার দাবি তুললে জনমনে অনাস্থা তৈরি হয়। তাই উগ্রবাদ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকার
তাগিদ দেন তিনি।
এদিকে
মাঠপর্যায়ের পুলিশ বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও দেশীয় বিস্ফোরক
উদ্ধারের পরপরই সর্বোচ্চ তৎপরতা গ্রহণ করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময়
এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জুলাই মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সংক্রান্ত মূল বৈঠকে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এবং ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ যৌথভাবে সমস্ত টিমকে প্রস্তুত থাকার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। রাজধানীজুড়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাচৌকি বা চেকপোস্ট বসিয়ে
সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বিভিন্ন যানবাহনে
চিরুনি তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের
মাধমে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক
পরিসরে জাতিসংঘের এমন আশঙ্কাজনক মন্তব্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে একের পর এক বিস্ফোরক
উদ্ধারের বিষয় দুটি একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় পুলিশের দায়িত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। তবুও একিউআইএস-এর নতুন সেল
গঠনের খবরটি নাকচ করে দিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমে পরিষ্কারভাবে নিশ্চিত করেন যে, জাতিসংঘের ওই দাবির সপক্ষে
বর্তমানে তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পৌঁছায়নি। একইভাবে সিটিটিসি প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বিষয়েটি নিয়ে
বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে না চেয়ে বিষয়টিকে
রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতার দিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে জুলাইয়ের শেষভাগে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি
আগেই নিশ্চিত করেছিলেন যে, অনলাইন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং পুলিশি নিজস্ব ডেটাবেজের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সতর্ক নজরদারি চালু রাখা হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে কেবল
পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক
ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতেই সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।