আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে চরম আক্রমণাত্মক ও নজিরবিহীন ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে যুদ্ধে পরাজিত করার পর ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন তিনি। গত শুক্রবার নিউইয়র্কের বিখ্যাত নাসাও জেলা পুলিশ একাডেমির এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
পুলিশ একাডেমির উক্ত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, এই যুদ্ধে ইরানকে খুব খারাপভাবে পরাজিত করার পর, শিগগিরই তিনি নিজে হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। তিনি আরও যোগ করেন, তারা সমগ্র বিশ্বের জন্য কত বড় একটি ঐতিহাসিক কাজ করতে যাচ্ছেন, তা আমেরিকানদের পাশাপাশি পুরো বিশ্ববাসীকে অবশ্যই চিরদিন স্মরণে রাখতে হবে। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ইরানের উপকূলীয় বন্দরগুলোতে যে কঠোর নৌ অবরোধ জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, তা অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন যে, এই নৌ অবরোধ সহজে থামবে না এবং এটি একটি ইস্পাতের দেওয়ালের মতো অটল থাকবে।
উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের তীব্র টানাপোড়েনের জের ধরে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে একযোগে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী। এর মধ্য দিয়েই মূলত প্রত্যক্ষ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সূচনা ঘটে। সামরিক সংঘাতের একদম প্রথম দিনেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো বিদেশি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ জারি করে তেহরান। পরবর্তীতে এর কড়া পাল্টা জবাব হিসেবে গত এপ্রিল মাসে ইরানের প্রধান প্রধান সমুদ্র বন্দরগুলোতে পাল্টা নৌ অবরোধ জারি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
দীর্ঘ তিন মাসের তীব্র সামরিক সংঘাতের পর গত ১৭ জুন পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু গত ৫ জুলাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অতর্কিত হামলা চালায়। এর ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সংঘাত ফের চরম আকার ধারণ করে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ১৩ জুলাই বহুল আলোচিত ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসে তেহরান এবং তারা হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে কঠোর অবরোধ জারি করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে কঠোরতম পাল্টা অবরোধ কার্যকর করে, যা বর্তমানেও বিদ্যমান।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের স্পষ্ট অবস্থান হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। এছাড়া এই দুই দেশের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জাহাজ যদি উক্ত প্রণালি ব্যবহার করতে চায়, তবে তাদেরকে অবশ্যই ইরানের ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে নির্ধারিত হারে টোল প্রদান করতে হবে। অবশ্য এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একবার ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধে ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালির মূল ‘অভিভাবক’ হবে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিটি বিদেশি জাহাজ থেকে তারা ২০ শতাংশ হারে টোল আদায় করবে, যদিও পরবর্তীতে তিনি সেই ঘোষণা থেকে কিছুটা সরে এসেছিলেন।
এদিকে শুক্রবার নিউইয়র্কের নাসাও জেলা পুলিশ একাডেমিতে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের তীব্র ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান সরকার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় স্পষ্ট লিখেছেন যে, ইরান কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক হুমকিতে ভয় পায় না এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনেও তেহরানকে দমানো সম্ভব নয়। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি অতীতে ইরানের ছিল, বর্তমানেও ইরানের আছে এবং ভবিষ্যতেও কেবল ইরানেরই থাকবে। এই প্রণালি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নির্দেশেই খোলা কিংবা বন্ধ করা হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না তাদের নিশ্চিত পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে ও তাদের অলীক কল্পনা ত্যাগ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরান হরমুজের ওপর এই কঠোর অবরোধ বজায় রাখবে।