দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ জন নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রাথমিক ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা দেখে নিহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বাড়ার তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এবং আন্তর্জাতিক বিখ্যাত গণমাধ্যম এএফপি ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, শনিবার (১৫ আগস্ট) স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে সমগ্র অঞ্চলে এই ভয়াবহ ও তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী এই ভূকম্পনটির প্রধান উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব নুসা তেঙ্গারা অঞ্চলের এন্দে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্রের তলদেশে, যার গভীরতা ছিল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার নিচে।
ভয়াবহ এই মূল কম্পনের পরপরই ওই অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ‘আফটার শক’ বা পরবর্তী তীব্র মৃদু ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের সবচেয়ে কাছের শহর এবং লোকালয়গুলোতে অসংখ্য বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে চরম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিক্কা ও নাগেকেও শহরের স্থানীয় অধিবাসীদের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে সেই মুহূর্তের ভয়াবহতা। তারা জানান, হঠাৎ করে তীব্র ভূকম্পন শুরু হলে মানুষের চোখের সামনেই বিশাল বিশাল ভবন ধসে পড়তে শুরু করে। চারদিকে প্রচণ্ড ধোঁয়া ও ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়। চরম আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল ছেড়ে খোলা রাস্তায় নেমে ছোটাছুটি করতে থাকেন এবং পুরো এলাকায় এক চরম বিশৃঙ্খল ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ভূমিকম্পের অস্বাভাবিক তীব্রতার কারণে শুরুতে পুরো পূর্ব ইন্দোনেশিয়াজুড়ে বড় ধরনের প্রলয়ঙ্কারী সুনামি আঘাত হানতে পারে বলে তীব্র সতর্কবার্তা জারি করেছিল সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বিশেষ করে পূর্ব নুসা তেঙ্গারা, পশ্চিম নুসা তেঙ্গারা, দক্ষিণ সুলাওয়েসি এবং দক্ষিণ-পূর্ব সুলাওয়েসি—এই চারটি উপকূলীয় ও দ্বীপভিত্তিক প্রদেশে জোরালো সুনামি সতর্কতা জারি করে স্থানীয় অধিবাসীদের নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ঘটনার কিছুক্ষণ পর সমুদ্রের পানিতে বড় ধরনের ক্ষতিকর জলোচ্ছ্বাসের আর কোনো প্রত্যক্ষ ঝুঁকি না থাকায় সেই সুনামি সতর্কতা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেয় ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থা।
উল্লেখ্য, ভৌগোলিকভাবে প্রায় ১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভূ-কম্পনপ্রবণ ‘রিং অব ফায়ার’ বা আগ্নেয় মেখলা অঞ্চলের ওপর অবস্থান করছে। ভৌগোলিক এই অবস্থানগত জটিলতার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে নিয়মিত বিরতিতে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও ভয়ংকর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার অতীত ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পটি ঘটেছিল ২০০৪ সালে। সেই সময়ে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ঐতিহাসিক ও ভয়াবহতম ভূকম্পন এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট প্রকাণ্ড সুনামির আঘাতে দেশটিতে একযোগে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারের ও বেশি মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছিল।