রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলী ঘাটে সরকারি নিয়মকে তোয়াক্কা না করে ফলবোঝাই ও খালি ট্রাক থেকে নির্বিচারে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তিন ঘণ্টার জন্য পার্কিং ফি প্রতি ট্রাক ১০০ টাকা হলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিভিন্ন অজুহাতে সরকারি ফির চেয়ে কোথাও কোথাও ২০ গুণেরও বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে ফলের খুচরা বাজারে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাদামতলী থেকে বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় রসিদ বই হাতে বিভিন্ন পয়েন্টে টাকা তুলছেন কয়েকজন ব্যক্তি। কাগজ মার্কেট, গ্লাস মার্কেট, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গের সামনে এই টাকা আদায়ের চিত্র দেখা যায়। ট্রাক রাখা, ট্রাক থেকে সরাসরি ফল বিক্রি কিংবা নিলামে তোলা—প্রতিটি ধাপেই আলাদা হারে টাকা ধার্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাক রাখার পরপরই কোনো সময় বিবেচনা না করে অন্তত ২ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সরেজমিনে এক চালকের মাধ্যমে জানা যায়, ট্রাক থেকে সরাসরি আঙুর বিক্রি ও নিলামের জন্য ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। বিক্রি শেষ না হলে পরদিন আবার নতুন করে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। এমনকি খালি ট্রাক অল্প সময়ের জন্য পার্ক করলেও দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা।
ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রফতানি ও ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে ট্রাকপ্রতি ৩০০ টাকা নেওয়া হয়, যা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন ও কল্যাণ তহবিলে জমা হয়। তবে ইজারাদার বা অন্যদের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বিপুল অঙ্কের টাকা আদায়ের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঢাকা দক্ষিণ মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী সুমন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে এই টাকা আদায় হচ্ছে। টাকা সংগ্রাহকরা জানান, সংগৃহীত অর্থ সোহরাব ও মিজানের মাধ্যমে সুমন ভূঁইয়ার কাছে পৌঁছায়। সংগ্রাহকদের দাবি, পার্কিংয়ের জন্য ১ হাজার টাকা, সরাসরি ফল বিক্রিতে ২ হাজার এবং নিলামে ফল বিক্রিতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়। বিক্রি শেষে খালি ট্রাক বের হতে হলেও ৪০০ টাকা দিতে হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, আদায়ের সঙ্গে যুবদলের কয়েকজন সক্রিয় কর্মী জড়িত। ঝিনাইদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা ট্রাকচালকরা জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চার-পাঁচ মাস পর থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নাম ভাঙিয়ে এই টাকা আদায় শুরু হয়েছে। আগে এই সড়কে ট্রাক রাখার জন্য কোনো টাকা দিতে হতো না।
বাদামতলী ঘাটের এই পার্কিং ইয়ার্ডটি ২০২৪ সালে এক বছরের জন্য ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন সিরাজদিখানের মধ্যপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবদুল করিম ওরফে করিম হাজী। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর করিম হাজী আত্মগোপনে চলে গেলে যুবদল ও শ্রমিক দলের স্থানীয় নেতারা অবৈধভাবে ইয়ার্ডটির নিয়ন্ত্রণ নেন। ইজারা হস্তান্তরিত না হলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিদিন বাদামতলীতে অন্তত ১৫০টি ট্রাক ঢোকে। গড় হিসাবে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার এবং খালি ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা নিলে দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। সে হিসাবে মাসে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার এবং বছরে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিশাল বাণিজ্য চলে।
অভিযোগের বিষয়ে সুমন ভূঁইয়া দাবি করেন, আগে যে পরিমাণ ফি নেওয়া হতো এখনও সেটাই নেওয়া হচ্ছে, তারা বাড়তি এক টাকাও নিচ্ছেন না। করিম হাজী আত্মগোপনে যাওয়ার পর থেকে তারা বিআইডব্লিউটিএ-এর মাসিক ইজারার টাকা পরিশোধ করছেন। ঘাট ও আশপাশের এলাকা ইজারার অংশ বলে দাবি করলেও, সরকারি সড়কে গাড়ি রাখা থেকে টাকা নেওয়ার বৈধ অনুমতি তাদের নেই বলে তিনি স্বীকার করেন। তার কার্যালয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের যাতায়াত ও নিয়মিত যোগাযোগও দেখা গেছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ওয়াইজঘাটে ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৬০র্থ৫ নম্বরের পুলিশ গাড়িতে টহলরত কোতোয়ালি থানার এসআই আরমানের নেতৃত্বাধীন দল সড়কের পাশে রাখা ট্রাক থেকে ৩০০ টাকা করে নিচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন চালকরা। টাকা না দিলে মামলার ভয় দেখানো হয়। প্রমাণ হিসেবে ছবি ও ভিডিও থাকার কথা জানালে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান এ বিষয়ে জানান, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাদামতলীতে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ চাপানোর কারণে শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে ফলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পাইকারিতে যে আঙুর ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, চাঁদার ভারে খুচরা বাজারে তা গিয়ে ঠেকছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজিতে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট না ভাঙলে বাজারে ফলের দামে স্বস্তি ফিরবে না।