নিহত মোহাম্মদ ওমর ফারুক রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভার তেতলাব/খালপার এলাকার মোহাম্মদ সবুজ মিয়া ও মোছাম্মদ ফারজানা বেগমের ছেলে। তিন সন্তানের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। তার বাবা পেশায় ফুটপাতের দোকানদার। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর ধরে সে উত্তর মাসাব, তারাবো পৌরসভার মাদ্রাসাতুত তাকওয়া আল ইসলামিয়া এতিমখানায় পড়াশোনা করছিল। নাজারা বিভাগে ২৬ পারা পর্যন্ত পড়াশোনা করা ওমর ফারুককে পরিবারের সদস্যরা মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ওমর ফারুকের দাদি জাকিয়া বেগম জানান, এর আগে দারুল মারিফ মাদ্রাসায়ও ওমর ফারুক মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিল। একাধিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে উত্তীর্ণ হয়েছিল। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা একটি ছবিতে তাকে একটি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে দেখা যায়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন মোট ২৪ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষকরা গোলাকান্দাইল নতুন বাজারের ৫ নম্বর ক্যানালে যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন তিনজন শিক্ষক। ওই সময় মাদ্রাসায় মোট শিক্ষার্থী ছিল ৭৫ জন। ২৪ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষকরা বাইরে যাওয়ার পর অন্য শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় অবস্থান করছিল।
বর্তমান পরিচালক হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ রমজান বিন আজিজ জানান, সারাদিন বিদ্যুৎ থাকবে না ঘোষণা ছিল, শিক্ষার্থীদের অনুরোধে ওই দিন তাদের খেলাধুলার জন্য গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ক্যানালে নেওয়া হয়। খেলাধুলা শেষে কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে অজু করতে যায় এবং অজু করার সময় গোসলও করে। পরে অন্য শিক্ষার্থীরা গোসলের অনুমতি চাইলে তাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়।
রমজান বিন আজিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে থাকা ২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ জন সাঁতার জানত এবং সাতজন সাঁতার জানত না। সাঁতার না জানা শিক্ষার্থীদের পুকুর পাড়ে, মাঠের ওপর বসিয়ে রাখা হয়েছিল। শিক্ষকরা ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের তদারকি করছিলেন। এরই একপর্যায়ে ওমর ফারুক ও আব্দুর রহমান শিক্ষকদের অজান্তে পানিতে নেমে যায়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি আনুমানিক বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘটে। স্থানীয় একটি ছেলে ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বাইজিদ প্রথম বিষয়টি দেখতে পায় এবং পরিচালককে জানায়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকরা উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। স্থানীয় লোকজনও তাদের সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন।
বর্তমান পরিচালক রমজান বিন আজিজ জানান, উদ্ধার কার্যক্রমের সময় তিনি আব্দুর রহমানকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। আব্দুর রহমান প্রথমে অচেতন ছিল। পরে জ্ঞান ফিরলে সে জানায়, ওমর ফারুক তাকে নিয়ে সেখানে নেমেছিল এবং তারা দুজন একসঙ্গে পানিতে গিয়েছিল। তবে ওমর ফারুককে তখনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয়ভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েও ওমর ফারুককে পাওয়া না যাওয়ায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ২ মিনিটে ৯৯৯-এ ফোন করা হয় এবং কলটির সময়কাল ছিল ৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড। পরে রূপগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং সন্ধ্যার দিকে ওমর ফারুকের মরদেহ উদ্ধার করে।
পরিবারকে খবর দেওয়ার বিষয়ে বর্তমান পরিচালক জানান, তিনি নতুন দায়িত্বে থাকায় এবং ঘটনাস্থলে থাকায় সরাসরি ওমর ফারুকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তাঁর কাছে থাকা মাদ্রাসার বাবুর্চি শাবানা বেগমের নম্বরের মাধ্যমে পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানো হয় বলে তিনি জানান। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সন্ধ্যা ৬টার দিকে একজন অভিভাবকের কাছ থেকে ওমর ফারুকের মৃত্যুর খবর পান এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সরাসরি তাদের বিষয়টি জানায়নি।
ওমর ফারুকের বাবা মোহাম্মদ সবুজ মিয়া শোকাহত ও বিচলিত থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে ওমরের দাদি জাকিয়া বেগম বক্তব্য দেন। শিক্ষকদের দায়িত্ব ও তদারকি সম্পর্কে তিনি বলেন, শিক্ষকেরা যদি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন এবং শিক্ষার্থীদের তদারকিতে আরও সতর্ক থাকতেন, তাহলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের তদারকিতে ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে।
ওমর ফারুকের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিবারের পক্ষ থেকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও তদন্তের ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। তাকে দক্ষিণ মাসাব কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই তারা পরবর্তী আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করবে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ওমর ফারুককে নামাজের নিয়ত বাঁধা অবস্থায় পানির মধ্য থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছে। বিষয়টি তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও তদন্তের ফলাফল দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।
ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এসআই ওয়াসিম মন্ডল। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করেছে। পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর সময় মাদ্রাসার কোনো শিক্ষককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের তদারকি ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করেননি।
মামলায় মাদ্রাসার সাবেক পরিচালক হাফেজ ক্বারী মাওলানা মো. তাজুল ইসলামকে আসামি করার বিষয়ে এসআই ওয়াসিম মন্ডল বলেন, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না। একইভাবে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের তদন্ত সম্পর্কেও তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই বলে জানান। ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও তিনি জানান। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা যাবে।
মাদ্রাসার সাবেক পরিচালক হাফেজ ক্বারী মাওলানা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে তিনি মাদ্রাসাটির সঙ্গে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট নন। তিনি বর্তমানে মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বেও নেই। এ ঘটনায় তাকে কোনোভাবে জড়িত করা অন্যায় বলে মনে করেন তিনি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমান পরিচালক হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ রমজান বিন আজিজের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন। ঘটনার সময়ও তাজুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং মাদ্রাসায় তাঁর দায়িত্বও ছিল না।
বর্তমান পরিচালক হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ রমজান বিন আজিজ জানান, তিনি প্রায় দেড় মাস আগে মাদ্রাসার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর বাড়ি খুলনায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে মাদ্রাসাটি সাবেক পরিচালক তাজুল ইসলামের অধীনে পরিচালিত হতো। বর্তমানে তিনি মাদ্রাসার সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানান, মাদ্রাসাটি নিজস্ব স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি ভাড়া করা প্রাইভেট মাদ্রাসা।
তাজুল ইসলামকে মামলায় আসামি করার বিষয়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা তাজুল ইসলামের কাছেই ওমর ফারুককে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। তাঁর দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি তাদের জানানো দরকার ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ করেছেন বর্তমান পরিচালক রমজান বিন আজিজ। তাঁর দাবি, এতে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নগদ ছিল বলে তিনি জানান।
নগদ অর্থের বিষয়ে রমজান বিন আজিজ জানান, তাঁর মা স্বর্ণ বন্ধক রেখে তাঁকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। একটি মোটরসাইকেল কেনার উদ্দেশ্যে তিনি ওই টাকা মাদ্রাসায় এনে রেখেছিলেন। পাশাপাশি মাদ্রাসার বিভিন্ন ফান্ডের লেনদেনের প্রায় ১ লাখ টাকা ছিল। সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নগদ ছিল বলে তাঁর দাবি।
হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় কারা জড়িত ছিল—এ বিষয়ে বর্তমান পরিচালক বলেন, বিষয়টি প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার সুযোগ নিয়ে যদি কোনো উগ্র, উচ্ছৃঙ্খল ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাট করে থাকে, তাহলে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যসহ অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ওমর ফারুকের পরিবারের পক্ষ থেকেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারের বক্তব্য, এসব ঘটনায় কারা জড়িত ছিল, তা সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ যেসব প্রমাণে যে বাস্তবতা উঠে আসবে, সেটিই তারা গ্রহণ করবে।
ঘটনার পর একদিকে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু, অন্যদিকে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওমর ফারুকের পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
বর্তমানে ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনা অপমৃত্যু মামলা হিসেবে তদন্তাধীন। মামলার নং ১৬/২৬, তারিখ ১৬/০৮/২০২৬।পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্যদিকে মৃত্যুর কারণ এবং মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ—দুই বিষয়েই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, নথিপত্র ও তদন্তের ফলাফলই পরবর্তী সময়ে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।