জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ৯ হাজার ৩ ৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছয়টি একেবারে নতুন এবং চারটি সংশোধিত প্রকল্প হিসেবে স্থান পেয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। উক্ত একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের অর্থনৈতিক উৎস বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ৯ হাজার ৩ ৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি থেকে জোগান দেওয়া হবে ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর বাকি প্রয়োজনীয় অর্থ প্রকল্প ঋণ হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
একনেকের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি বড় প্রকল্প অনুমোদন লাভ করেছে। এই ক্যাটাগরিতে অনুমোদিত প্রকল্প দুটি হলো ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ’ এবং ‘১০টি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আধুনিক সুবিধা সম্বলিত ১৯টি হোস্টেল ভবন নির্মাণ’ সংক্রান্ত প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী। এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাত এবং চিকিৎসা শিক্ষার অবকাঠামোগত মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন লাভ করেছে। এই প্রকল্পটি হলো ‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট ফর স্মার্ট মেইনটেন্যান্স টেকনোলজি অফ ব্রিজেস আন্ডার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ (Capacity Development for Smart Maintenance Technology of Bridges under Roads and Highways Department in Bangladesh)। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে থাকা সেতুগুলোর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এলাকা রক্ষা ও বাঁধ শক্তিশালীকরণ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও এই একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ‘ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন হতে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলা রক্ষা’ প্রকল্প। দ্বিতীয় প্রকল্পটি হলো ‘চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এবং বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট হতে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প। এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় নদীভাঙন রোধ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক বৃহৎ প্রকল্পটি একনেকের এই সভায় অনুমোদন লাভ করেছে।
তাছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ খাতের সার্বিক মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারকরণ’ নামক তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্পটি একনেক থেকে পাস হয়েছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি আলাদা প্রকল্প একনেক সভায় সবুজ সংকেত পেয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ সংক্রান্ত দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প, যা দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয় প্রকল্পটি হলো ‘ঢাকাস্থ ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ’ সংক্রান্ত প্রথম সংশোধিত প্রকল্প, যা রাজধানী ও আশপাশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী করে তুলবে।
একই সভায় দেশের প্রতিরক্ষা খাতের সার্বিক সুবিধাদি আধুনিকায়ন করতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা ‘রামু সেনানিবাসের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পটিও অনুমোদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই একনেক সভায় সরকারের পরিকল্পনা সংক্রান্ত নীতিমালার আওতায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক এরই মধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত মোট নয়টি ছোট ও সম্ভাব্যতা যাচাইমূলক প্রকল্প সম্পর্কে পুরো একনেক কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
অবহিতকরণ তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএসএল-৩ গবেষণাগার স্থাপন ও ভ্যাকসিন এবং বায়োলজিক্স গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (বেস্ট) প্রথম সংশোধিত প্রকল্প, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রান্সমিশন গ্রিড সম্প্রসারণ দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প, ঢাকার গুলশানে ১৩২/৩৩/১১ কেভি ভূগর্ভস্থ গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প, মসজিদ পাঠাগার সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ চতুর্থ পর্যায় প্রকল্প এবং তথ্য ও সম্প্রসারণ মন্ত্রণালয়ের জনসেবা প্রদানে নিউ মিডিয়ার সর্বোত্তম ব্যবহার সংক্রান্ত বিশেষ প্রকল্প। একনেকের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চাকা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে।