অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামীকাল ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে ভোটাররা গোপন ব্যালটে নয়, প্রকাশ্য বা ‘ওপেন’ ব্যালটে ভোট দেবেন। ফলে কোন ভোটার কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা ভোটকক্ষে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
বুধবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দীন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব সিইসির ওপর ন্যস্ত থাকায় তিনি নিজেই নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন।
সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের সমন্বয়ে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় মহড়া ও প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর একই দিন ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে এ বিষয়ে গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয়।
সিইসি জানান, বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি ছিল। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মহড়া ও প্রস্তুতির মাধ্যমে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বলেও জানান সিইসি।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিন সময় রেখে এ বিষয়ে গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে ড. অলি আহমদের নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। অন্যদিকে বর্তমান সরকারি দল বিএনপির পক্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে একটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ভোট হবে।
১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও কোনো প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দুই প্রার্থীর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে।
ভোটার তালিকার ক্রম নিয়ে সিইসি বলেন, সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবান পর্যন্ত ৩০০ আসন থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটিং কার্যক্রম সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে ভোটার তালিকায় বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ধারাবাহিকতা না থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী তা সমাধান করা হয়েছে।
সিইসি জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৪৯ জন। আগামীকাল ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই নির্বাচনের সব সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিকেল ৫টার পরপরই ভোট গণনা শুরু হবে। গণনা শেষে ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন সিইসি নিজেই। তিনি জানান, পুরো গণনা প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছ রাখা হবে।
ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় সংসদ সদস্যরা কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন। ব্যালট পত্রে ভোটার ও প্রার্থীদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ফলে কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত সবার কাছে প্রকাশ্য থাকবে। ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ফলাফল গণনার পর্ব বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সংসদ ভবনের অভ্যন্তরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের। তবে ভোটের দিন সংসদ ভবনের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
নির্বাচন ঘিরে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা খরচের যে খবর ছড়িয়েছে, সেটিকে গুজব বলে মন্তব্য করেন সিইসি। তিনি বলেন, সংসদের বৈঠক আহ্বানের মতো নিয়মিত কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া নির্বাচন কমিশনের আলাদা কোনো বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে বলেও উল্লেখ করেন এ এম এম নাসির উদ্দীন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবে।