অনলাইন ডেস্ক
কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচাতে জানালা দিয়ে বের হয়ে কার্নিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলাদেশি দম্পতি সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা কার্নিসে অবস্থান করে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে এবং চিৎকার করে তারা উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। পরে দমকলকর্মীরা মই দিয়ে তাদের নিরাপদে নামিয়ে আনেন।
নিউমার্কেট এলাকার চারতলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় হোটেলটির অবস্থান। সোমাইয়া ও রেজাউল প্রায় এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় বেড়াতে যান। অগ্নিকাণ্ডের দুই দিন আগে তারা শিখা ইন হোটেলে ওঠেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে হোটেলে আগুন লাগার পর তাদের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ আতঙ্ক। সোমাইয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে তাদের কক্ষের দরজায় হঠাৎ জোরে ধাক্কা দিতে থাকেন কেউ। সে সময় সোমাইয়া জেগে ছিলেন। ধাক্কার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় রেজাউলেরও।
দুজন দ্রুত বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দেখতে পান, বারান্দা ঘন ধোঁয়ায় ভরে গেছে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রেজাউল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা না করে জানালা দিয়ে বের হতে হবে। এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে জানালার কাছে যান রেজাউল। সেখান থেকে দুজন নেমে আশ্রয় নেন ভবনের কার্নিসে। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে ওই অবস্থানই তখন তাদের কাছে নিরাপদ মনে হয়।
কার্নিসে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন সোমাইয়া। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে ওপর থেকে নিচের রাস্তা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। একইভাবে নিচে থাকা লোকজনের পক্ষেও ভবনের ওপরের অংশে তাদের অবস্থান বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
উদ্ধারকারীদের নজরে আসার জন্য দম্পতি মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকজনকেও তাদের বিপদের কথা জানান। সোমাইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ মিনিট তারা কার্নিসে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
পরে ঘটনাস্থলে থাকা দমকলকর্মীরা মই ব্যবহার করে তৃতীয় তলার কার্নিস থেকে সোমাইয়া ও রেজাউলকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনেন। এভাবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তারা।
শিখা ইন হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে শুধু সোমাইয়া ও রেজাউলই বিপদে পড়েননি। ভবনের অন্যান্য হোটেলেও কয়েকজন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন। তাদের কেউ চিকিৎসার জন্য, আবার কেউ ব্যবসায়িক কাজে ভারতে গিয়েছিলেন। এই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।
ভয়াবহ এই ঘটনায় হোটেলে থাকা লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ার কারণে অনেকে কক্ষ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। উদ্ধার অভিযানে দমকলকর্মীদের নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সোমাইয়া ও রেজাউলের বর্ণনায় উঠে এসেছে, আগুন লাগার পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই কীভাবে একটি হোটেল কক্ষ প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামের জায়গায় পরিণত হয়েছিল। দরজা খুলে ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসাই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষা করেছে।