খুলনা প্রতিনিধি
হাটে শাকসবজি বা গবাদিপশু নয়, কেনাবেচা হচ্ছে রক্তমাংসের মানুষ! খুলনা জেলার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী চালনা বাজারের সাপ্তাহিক হাটে জমে উঠেছে এমন এক নজরকাড়া শ্রমবাজার। চলতি রোপা আমন মৌসুমে ধান রোপণের চরম ব্যস্ততায় সপ্তাহের প্রতি বুধবার চড়া দামে ‘বিক্রি’ হচ্ছেন হাজার হাজার দিনমজুর।
জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে বুধবার চালনা হাটের দিন ভোর হতেই আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে শত শত খেটে খাওয়া মানুষ ছুটে আসেন এই চালনা বাজারে। নিজেদের শ্রম ও কাজের চুক্তির বিনিময়ে হাটে তোলার এই ব্যতিক্রমী কেনাবেচার দরদাম ভোর থেকে শুরু হয়ে দিনভর চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
এক সপ্তাহের চুক্তিতে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দরে ‘বিক্রি’ হচ্ছেন একেকজন দিনমজুর। চুক্তির এই নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত শ্রমিককে অবস্থান করতে হয় ক্রেতা বা মালিকের নিজ বাড়িতে। পুরো এক সপ্তাহ রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ সম্পন্ন করার পরেই কেবল মেলে চুক্তিভিত্তিক এই নির্ধারিত মজুরি।
হাটে কাজের খোঁজে সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে আসা দিনমজুর রহমত আলী নিজের দুঃখের কথা জানিয়ে বলেন, নিজেদের এলাকায় এখন তেমন কোনো কাজ নেই, তাই আমন মৌসুমে পেটের তাগিদে চালনা হাটে আসতে হয়েছে। দিনে এক হাজার টাকা রোজগার না হলেও সপ্তাহের চুক্তিতে অন্তত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়, তাই নিজেকে এভাবে হাটে সঁপে দেওয়া।
অন্যদিকে শ্রমিক কিনতে আসা উপজেলার গুনারী এলাকার গৃহস্থ ভবেন বিশ্বাস জানান, এ বছর আমন রোপণের একদম মোক্ষম সময় চলছে। কিন্তু স্থানীয় এলাকায় ক্ষেতের কাজের লোকের ভীষণ অভাব দেখা দিয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই চালনা হাটে এসে চড়া দামে সপ্তাহ মেয়াদে শ্রমিক কিনতে হচ্ছে। এ বছর শ্রমের দাম অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি।
তবে হাটে আসা সব দিনমজুরকে নিয়ে সফলতার গল্প লেখা হয় না। একদিকে যেমন শত শত শ্রমিকের দরদাম চুকে যায় এবং তারা নতুন মালিকের গন্তব্যে রওনা হন, ঠিক তেমনি উপযুক্ত দরদাম না মেলায় বা ক্রেতার অভাবে অনেককেই দিনশেষে ক্লান্ত ও মলিন মুখে ফিরে যেতে হয় নিজ গন্তব্যে কিংবা পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো হাটে। পেটের তাগিদে ও জীবনসংগ্রামে মানুষের নিজেকে ‘বিক্রি’ করার এই লড়াই চালনা হাটের এক দীর্ঘদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও ব্যতিক্রমী বাস্তবতা।
স্থানীয় শ্রমিক নেতা আজিম হাওলাদার জানান, কাজের মৌসুমে চরম চাহিদার কারণে শ্রমিকরা তুলনামূলক ভালো দাম পান ঠিকই, তবে হাটে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশ্রামের স্থান বা শেড নেই। রোদে-বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগ সয়ে তাদের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব দিনমজুরদের থাকার জায়গা ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, আমন মৌসুমে এ অঞ্চলে স্থানীয় কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফলে বাইরের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে শ্রমজীবী মানুষ কাজের খোঁজে চালনা হাটে আসেন। মূলত ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক দরদামের মাধ্যমেই এটি পরিচালিত হয়। তবে বাইরে থেকে আসা এসব শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা সজাগ ও সচেতন রয়েছে।