বিশ্ব বাণিজ্য ও বিশ্ব জ্বালানি সাপ্লাই চেইনের অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বিতর্কিত বক্তব্যের পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে তেহরানের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট। পাল্টাপাল্টি মানচিত্র প্রকাশের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের চরম টানাপোড়েনের চিত্র আবারও প্রকাশ্যে উঠে এলো।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত মঙ্গলবার, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে হরমুজ প্রণালির একটি বিশেষ মানচিত্র প্রকাশ করেন। সেই মানচিত্রে কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এই আন্তর্জাতিক জলপথটিকে নীল বৃত্তে চিহ্নিত করে তার নিচে লিখে দেওয়া হয় ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এলাকা’। যুদ্ধ শেষ হলে আন্তর্জাতিক এই প্রণালিকে আমেরিকার সম্পত্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগের মন্তব্যের ধারাবাহিকতায় পোস্টটি করা হয়। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের সরকারি বার্তা বিনিময়ের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত মানচিত্রটি পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ রয়েছে, তা শিগগিরই নিজে থেকে সংশোধন হবে, আর যদি তা না হয় তবে ইরান নিজেদের শক্তিতে তা সংশোধন করে দেবে।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইরানের ‘ইরান ইন হায়দ্রাবাদ’ নামের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা একটি পাল্টা মানচিত্রে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র পোস্ট করে দেশটির ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যকে নীল রঙে ফুটিয়ে তুলে লেখে, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের নতুন ভূখণ্ড।’ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া মূলত বিশাল সংখ্যক ইরানি-আমেরিকান প্রবাসীর প্রধান বাসস্থান। বিশ্বখ্যাত ইউসিএলএ-র সেন্টার ফর নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজের তৈরি ড্যাশবোর্ডের ডেটা অনুযায়ী, শুধু লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টিতেই প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান স্থায়ীভাবে বাস করেন।
বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইরানি বিপ্লবের পর থেকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ইরানি অভিবাসীদের জনসংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশেষ একটি অঞ্চল পশ্চিম উপকূলের প্রবাসীদের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়, যা স্থানীয় সংস্কৃতিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘তেহরাঞ্জেলেস’ নামে ব্যাপক পরিচিত। তেহরান থেকে এই অঞ্চলে বিশাল জনসংখ্যার উপস্থিতিকে ইঙ্গিত করেই ক্যালিফোর্নিয়াকে নিয়ে পাল্টা কটাক্ষ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হরমুজ প্রণালির এই সীমানা ও স্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন উভয় দেশের পরোক্ষ কূটনৈতিক চুক্তি ও আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সংঘাত এড়িয়ে একটি মধ্যবর্তী চুক্তিতে পৌঁছাতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে জুনে সমঝোতা স্মারক সই হলেও হরমুজে স্বাধীন জাহাজ চলাচল ও বিধিমালা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আলোচনা এগোয়নি। বর্তমানে ওমানের মধ্যস্থতায় সমুদ্রসীমায় নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখা নিয়ে ইরানের আলাপ আলোচনা চালু থাকলেও কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর