যে বয়সে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে আর বাবার বুকে মাথা রেখে ধীরে ধীরে পৃথিবী চেনার কথা, ঠিক সেই বয়সে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াইয়ে নেমেছিল সাড়ে পাঁচ মাসের শিশু মোহাম্মদ সাইফান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। প্রথমে হামে আক্রান্ত হওয়া এবং পরবর্তীতে শরীরের একের পর এক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিলতা দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরতরে চলে গেছে সে।
শুক্রবার ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের একটি পারিবারিক কবরস্থানে সাইফানের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জানা গেছে, শিশুটির বাবা মোহাম্মদ কাওছার পেশায় একজন স্থানীয় সাংবাদিক এবং মা ফোজিয়া আক্তার ইভা। এটি ছিল এই দম্পতির প্রথম সন্তান, যার জন্ম হয়েছিল চলতি বছরের ৪ মার্চ। কিন্তু মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় কোল খালি হয়ে যাওয়ায় পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা যায়, গত ৭ আগস্ট সকালে সাইফানের শরীর হঠাৎ বেশ খারাপ হতে শুরু করে। এর আগে তার শরীরে হামের স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। শুরুতে স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং শরীরে লালচে দানা বা লুতি ওঠার পর কয়েকদিন নিয়মিত ওষুধ দেওয়ায় শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার শরীরের অবস্থা আবারও মারাত্মক অবনতি হলে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে সাইফানকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার অপর একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যুর কাছে হার মানে শিশুটি।
সাইফানের বাবা জানান, হামের চিকিৎসা চলার সময় তার ছেলের পরপর দুবার মারাত্মক খিঁচুনি হয়, যা তার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এরপর ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের জটিলতাসহ একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে থাকে। একপর্যায়ে দীর্ঘ দিন আইসিইউতে রাখার পর শেষ দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টও দিতে হয়েছিল।
সন্তানকে হারিয়ে আকুল কণ্ঠে বাবা মোহাম্মদ কাওছার জানান, নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি অনুযায়ী হামের প্রথম টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই তার ছেলে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। সচেতনতার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, তার সন্তানের মতো আর কোনো নিষ্পাপ শিশু যেন এভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ না হারায়। সেজন্য দেশের সর্বস্তরের পরিবার থেকে শুরু করে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আকুল আবেদন জানান তিনি।