ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া ঐতিহাসিক আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন করে এর পূর্বের স্বাভাবিক রূপ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করার স্বার্থে ঢাকা শহরের প্রতিটি খাল ও নদীকে ময়লা-আবর্জনা মুক্ত রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেকশন ব্রিজ সংলগ্ন আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের অংশে ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং সামাজিক স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা বিডি ক্লিনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর পূর্বে উপস্থিত বিডি ক্লিনের স্বেচ্ছাসেবী সদস্য এবং অন্যান্য সকল অংশীজনদের একসঙ্গে নিয়ে শপথবাক্য পাঠ করান মীর শাহে আলম।
পরবর্তীতে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের পরিবেশ এবং স্থানীয় নাগরিকদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার তাগিদে শহরের প্রতিটি খাল ও নদীকে সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা জরুরি। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিডি ক্লিনের এই প্রশংসনীয় যৌথ উদ্যোগ সত্যিই দৃষ্টান্তমূলক। আশা করা যাচ্ছে, এই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং অচিরেই স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা এর সুফল পেতে শুরু করবেন।
মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল থেকে বহু বছরের জমে থাকা ময়লার ভাগাড় অপসারণ করে এর প্রাচীন ও স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় রূপরেখা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে সরাসরি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই বিশেষ নির্দেশনার আলোকেই সম্পূর্ণ চ্যানেলটি পরিচ্ছন্ন করা, স্বাভাবিক নাব্য নিশ্চিত করা এবং নদীর দুই পাড়ে মনোরম সৌন্দর্যবর্ধনের সুনির্দিষ্ট মহপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঢাকার প্রাচীনতম নদী ও জলধারাসমূহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত এই আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.২ কিলোমিটার। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ১ হাজার ফুট অংশ অবস্থিত দূরানী ব্রিজ সংলগ্ন অঞ্চলে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয়দের অবৈধ দখল এবং লাগামহীন বর্জ্য ফেলার ফলে চ্যানেলটির বিভিন্ন এলাকা বিশাল ময়লার ভাগাড় ও স্থায়ী ময়লার স্তূপে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ, মশার মারাত্মক উপদ্রবসহ সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে রাজধানী ঢাকাকে আকস্মিক বন্যার হাত থেকে স্থায়ী রক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে এর পরপরই আদি বুড়িওগঙ্গা চ্যানেলের স্বাভাবিক পানির প্রবাহ মারাত্মভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে দখলদারদের তাণ্ডব ও বর্জ্য ফেলার কারণে চ্যানেলটির অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের দিকে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে চ্যানেলটির বড় একটি অংশ দখলমুক্ত করা হয়েছিল।
বর্তমানে চ্যানেলটিকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী এক জলাধারে রূপান্তরিত করতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং বিডি ক্লিনের বিপুলসংখ্যক সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণে পুরো চ্যানেলে জমে থাকা সব ময়লা এবং বর্জ্য সরাতে কাজ চলছে। একইসঙ্গে খাল কিংবা নদীতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার বিষয়ে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিচ্ছন্নতা অভিযানটি সমাপ্ত হওয়ার পরেই চ্যানেলে পানির মূল প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ড্রেজিং কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি পরিবেশের সামঞ্জস্য রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে এবং নান্দনিক বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণেরও মহাপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
উক্ত পরিচ্ছন্নতা অভিযান অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসমেত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।