আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি:
দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে যে স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়েছিল, আজ সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থার জায়গাটিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, ব্যাংক-বীমা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের রুই-কাতলাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার কথা, সেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অঢেল সম্পদ অর্জনের মারাত্মক অভিযোগ। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ৪২ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে স্বয়ং কমিশনই।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়ান-イレভেনের পরবর্তী সময়ে এবং পরবর্তীতে প্রেষণে ও নিজস্ব স্থায়ী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওমর ফারুক বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, বদলি বাণিজ্য ও তদবিরের মাধ্যমে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর এই ৪২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য বর্তমানে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের দল কাজ করছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজের নামে ছাড়াও স্বজন ও ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন করেছেন। ব্যাংকগুলোতে তাঁর নামে থাকা সঞ্চয়ী হিসাব, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নথিপত্র ইতোমধ্যে তলব ও জব্দ করা হয়েছে। একই সাথে তাঁকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের নির্ভুল বিবরণী দাখিল করার জন্য আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান শেষ হলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের ও চার্জশিট পেশ করা হবে।
একজন সাধারণ নাগরিক বা সাধারণ পেশাজীবীর দুর্নীতির চেয়ে দুদকের সাবেক ডিজি পদের কর্মকর্তার এই ৪২ কোটি টাকার অর্থ আত্মসাটের অভিযোগ বহুগুণ বেশি উদ্বেগজনক ও ক্ষতিকর। ৪২ কোটি টাকার আর্থিক পরিমাপ কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; এই বিপুল অর্থ দিয়ে দেশের একটি অনুন্নত উপজেলায় অন্তত ৪-৫টি আধুনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ কিংবা একটি পরিপূর্ণ সুবিধা সংবলিত ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা সম্ভব হতো। সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থের এমন অপচয় ও আত্মসাত কেবল জাতীয় অর্থনীতিতেই আঘাত হানে না, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেয়।
কমিশনের সাবেক এক শীর্ষ কর্তার এমন কাণ্ড 'সর্ষের মধ্যেই ভূত' থাকার বহুল প্রচারিত প্রবাদটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যে প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কাজ অপরাধীদের পাকড়াও করা ও দুর্নীতি দমন করা, সেই কাঠামোর ভেতরেই যখন দুর্নীতির নিরাপদ ঘাঁটি তৈরি হয়, তখন দেশের সাধারণ মানুষ ন্যাায়বিচারের জন্য কার দরজায় কড়া নাড়বে—এই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। এই একটি মাত্র ঘটনা দুদকের বিগত বহু বছরের অর্জিত সকল ইতিবাচক কাজ, শত শত সফল ট্র্যাপ অভিযান ও মামলা পরিচালনার সাফল্যকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দুদক আইন ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতার বড় ধরনের ঘাটতি স্পষ্ট। বর্তমানে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের ছাড়াও কমিশনে বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ২ হাজার ১৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এসব নিম্ন ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশের সম্পদ বৃদ্ধি ও আচরণের ওপর কার্যকর ও নিয়মিত নজরদারির কোনো সুনির্দিষ্ট মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং অন্যান্য সুশাসনভিত্তিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাৎসরিক সম্পদের হিসাব এখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় না। তাছাড়া সংস্থার ভেতরের কোনো বড় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যায়, যা অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বর্তমান কমিশনের সামনে এখন এক কঠিন ঐতিহাসিক পরীক্ষা। সাবেক সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে তাঁর সততা, ন্যায়বিচার ও নিষ্ঠার প্রতি দেশের মানুষের অগাধ আস্থা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে ওমর ফারুকের এই ৪২ কোটি টাকার মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত অতি দ্রুত সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে আদালতে চার্জশিট পেশ করতে হবে। কারণ, এই মামলাটি কেবল ওমর ফারুকের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; এটি প্রমাণ করবে যে দুদক আসলেই ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত হয়ে নিজের ঘরের অপরাধীদের বিচারে স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারে কিনা।
একই সাথে কমিশনকে সর্বগ্রাসী ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে কালক্ষেপণ না করে এক ব্যাপক অভ্যন্তরীণ 'শুদ্ধি অভিযান' পরিচালনা করা জরুরি। কমিশনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে অফিস সহায়কের পদ পর্যন্ত প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বার্ষিক সম্পদের হিসাব প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দুদকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। এছাড়া সংস্থার ভেতরের দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা ও বরখাস্তের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে ভেতরের কোনো সৎ কর্মকর্তা যাতে ভয়হীনভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন, সেজন্য শক্তিশালী ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ বা তথ্য প্রকাশকারী সুরক্ষা আইনের শতভাগ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পথে সবচেয়ে বড় স্থায়ী অন্তরায় হলো অনিয়ম ও দুর্নীতি। আর দুর্নীতিকে যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়বে। প্রধান বিচারালয় থেকে আসা অভিজ্ঞ নেতৃত্বের হাতে এখন দুদকের ব্যাটন। নিজের ঘর পরিষ্কার করার মাধ্যমে এই কঠোর 'জিরো টলারেন্স' নীতির বাস্তব বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব হলে, তবেই গোটা দেশে দুর্নীতিবিরোধী বার্তা কার্যকর হবে এবং মানুষ আবারও আস্থা ফিরে পাবে।
আকাশজমিন / আরআর