রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্রে একজন প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তাঁর সহধর্মিণী এবং তাঁদের দুই প্রিয় সন্তানকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো রংপুর অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লোমহর্ষক এই চার খুনের পেছনে মূল রহস্য বা আসল কারণ কী, তা নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই চার খুনের ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে প্রথম দিকে পুলিশ প্রশাসন বিষয়টিকে একটি সংগঠিত ডাকাতির ঘটনা বলে সাধারণ অনুমান করলেও, পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই সংবাদ সম্মেলন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চমকপ্রদ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে। পুলিশ দাবি করেছে, ছাদে উঠে উন্মুক্তভাবে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা সেবন করতে বাধা দেওয়ার জের ধরেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পর পর চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশ করা এই চাঞ্চল্যকর দাবি এবং মামলার গতিপথ নিয়ে নিহত শিক্ষকের প্রবীণ স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় এলাকাবাসী চরম সন্দেহ ও জোরালো প্রকাশ্য অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
এর আগে গত শনিবার রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে রংপুর নগরীর কামালকাছনা এলাকার একটি নির্মাণাধীন তিনতলা বসতবাড়ি থেকে একে একে পরিবারের চারজন সদস্যের নিথর ও রক্তসংক্রান্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ প্রশাসন। বীভৎসভাবে উদ্ধার করা ওই চারটি মৃতদেহ হলো—রংপুর জিলা স্কুলের প্রখ্যাত অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর ধর্মপ্রাণ স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), তাঁদের একমাত্র মেধাবী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং আদরের কনিষ্ঠ সন্তান আয়ুশ চক্রবর্তী (১৩)। লোমহর্ষক এই বর্বর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল রবিবার ভোরের দিকে তড়িঘড়ি করে দুজনকে আটক করার কথা সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে রংপুর পুলিশ প্রশাসন। আটক হওয়া সেই দুই তরুণ হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) এবং মুগ্ধ দাস (২৩)। তাঁদের উভয়ের নিজ বাড়ি নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর নিজস্ব বসতবাড়ির একেবারে খুব কাছেই অবস্থিত। এর পরপরই গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিষদ বিবরণ সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে রংপুর মহানগর পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, প্রকাশ্য ছাদে উঠে মাদকদ্রব্য ইয়াবা সেবন করার মুহূর্তে প্রবীণ শিক্ষক বাধার সৃষ্টি করায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর সহধর্মিণী এবং তাঁদের দুই সন্তানকে অতি ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে একে একে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। শুধু তাই নয়, নৃশংসতম এই খুনের ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপকৌশল হিসেবে ঘাতক তরুণরা ঘরের ভেতরে আলমারি ও ড্রয়ারের যাবতীয় মূল্যবান জিনিসপত্র ইতস্তত ছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে একটি সাধারণ ডাকাতির নাটক সাজানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল।
পুলিশের দাপ্তরিক ভাষ্য বিবরণী অনুযায়ী জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবন দিয়ে অতি চতুরতার সাথে গণপতি চক্রবর্তীর তিনতলা বাড়ির ছাদে অবৈধভাবে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা নিরিবিলিতে ইয়াবা সেবন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের সেখানে দেখে ফেলেন এবং চরম আপত্তি ও বাধা দিলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। গণপতির আকস্মিক চিৎকার ও গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে নিচে থাকা স্ত্রী প্রীতিলতা এবং তরুণী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী দ্রুত ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাঁদের দুজনকে সিঁড়িতেই দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করেন ঘাতকরা। সবার শেষে ঘরের ভেতর নিজের বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা কনিষ্ঠ সন্তান আয়ুশকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসের পথ বন্ধ করে মেরে ফেলা হয়। পুলিশ কমিশনার আরও উল্লেখ করেন, গণপতির পরিবারের সাথে দুই তরুণের আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। ফলে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা এবং পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কায় অপরাধীরা পুরো পরিবারের চার সদস্যকেই একে একে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।
রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তাঁর সম্মেলন কক্ষে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানান, চারজনকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার পরও অপরাধীরা আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে না গিয়ে দীর্ঘ সময় সেই বাড়িতেই নিশ্চিন্তে অবস্থান করেন। সেখানে তাঁরা বাথরুমে ঢুকে দীর্ঘ সময় গোসল করেন, ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর খুলে খেজুর ও শসা বের করে পরম তৃপ্তিতে খান এবং নতুন করে আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমা আর্ন্তজাতিক নামাজের সময় যখন আশেপাশের রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা হয়ে যায়, ঠিক সেই সুযোগে তাঁরা নিঃশব্দে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। আর স্থান ত্যাগের ঠিক পূর্বে ঘরের ভেতরের ড্রয়ার ও আলমারি খুলে সব জামাকাপড় তছনছ করে দেন। ঘটনার পর তদন্তে নেমে পুলিশ ওই ঘর থেকে মাদক সেবনের কিছু সরঞ্জাম এবং একটি খাঁটি সোনার চুড়ি আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করার অখণ্ড আলামত উদ্ধার করে। সেই আলামতের সূত্র ধরেই অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা নিজেদের অপরাধ শিকার করে নিয়েছেন বলে দাবি পুলিশের। উল্লেখ্য, অভিযুক্তদের মধ্যে মুগ্ধ দাস স্থানীয় সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে দৈনিক কাজ করেন এবং সিদ্ধার্থ দাস জুয়েলারি দোকানের গয়নার প্রবীণ কারিগর ছিলেন।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা এসব গল্প একেবারেই অলৌকিক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনেরা। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী চরম বিভ্রান্তি প্রকাশ করে জানান, ‘পুলিশ কী বলছে তা কিছুই বুঝতে পারছি না। দুজন সামান্য ইয়াবাখোর নাকি একে একে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলল!’ এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রংপুর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন এবং পরে পুলিশ গ্রেপ্তার তরুণদের সেই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখায়।
গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা সাধারণ মানুষের যুক্তিতে মোটেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাত্র দুইজন কম বয়সী হালকা শারীরিক গঠনের ছেলে একসাথে চারটা জলজ্যান্ত মানুষকে কোনো বাধা ছাড়া মেরে ফেলতে পারে না। শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকেও ওই দুই তরুণের চারজন মানুষকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার ক্ষমতা নেই। এই তদন্তের পেছনে অনেক গভীর প্রশ্ন রয়ে গেছে।’ অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস এবং মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাসও নিজেদের ছেলেদের নেশাগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও এমন ভয়াবহ পৈশাচিক চার খুনের সাথে তাঁদের জড়িয়ে পড়ার কথা চরম অবিশ্বাস প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
নিহতদের পার পারিবারিক পটভূমি থেকে জানা যায়, রংপুর জিলা স্কুলের জনপ্রিয় হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সদ্য ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন এবং ছোট ছেলে আয়ুশ জিলা স্কুলেরই পঞ্চম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় এই পরিবারটি বসবাস করত। গত শনিবার রাতে নিখোঁজ পরিবারের খোঁজ নিতে এসে স্বজনেরা জানালার কাচ ভেঙে তছনছ ঘরের মেঝে ও সিঁড়িতে লাশগুলো দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরদিন এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও প্রকৃত ঘাতকদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জিলা স্কুলের সহস্র ছাত্র ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পাশাপাশি রংপুর মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকেও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি নগরীর শান্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্বজনদের করুণ আর্তনাদ, পরম আপনজনদের হারিয়ে শোকস্তব্ধ পুরো রংপুর শহরের প্রতিটি মানুষ এখন কেবলই প্রশ্ন তুলছেন—নিজের তৈরি ঘরের ভেতরেও যদি পরিবারের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা না থাকে, তবে সাধারণ নাগরিকেরা আজ কোথায় গিয়ে বাস করবে?