সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে দেশে লোডশেডিং এবং যান্ত্রিক গোলযোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের কাজের প্রয়োজনে আপনাকে হয়ত অফিসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা কেনাকাটার জন্য বহুতল ভবনের শপিং মলে উঠে লিফট ব্যবহার করতে হচ্ছে। হয়তো আপনার গন্তব্য আর মাত্র কয়েক তলা পরেই ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটি হঠাৎ বিকট ঝাঁকুনি দিয়ে থমকে গেল লিফটের চাকা, নিভে গেল ভিতরের আলো এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল লিফটের ভারী দুটি দরজা। এমন এক চরম দমবন্ধ পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের বুকের ভেতর ধকধক করে ওঠে, কপালে জমে ঠাণ্ডা ঘাম আর মাথায় কেবল একটিই দুশ্চিন্তা ঘুরে ফিরে আসে—‘এখন আমার কী হবে?’ মনে হতে পারে, ছোট্ট ও বদ্ধ এই চার দেয়ালের জায়গাটাই যেন হঠাৎ করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর এক আতঙ্কের নাম। কিন্তু এই ধরনের জটিল মুহূর্তে চরম ভয় পেয়ে ছটফট কিংবা মাতম করার বদলে আপনার মাথা সম্পূর্ণ ঠান্ডা রাখতে হবে। কারণ আধুনিক লিফটে হঠাৎ করে আটকে পড়লে আপনার প্রথম ও প্রধান কাজ কিন্তু কোনোভাবে জোর করে বাইরে বেরিয়ে আসা নয়, বরং নিজের জীবন সুরক্ষিত রাখা এবং সঠিক উপায়ে উদ্ধারকর্মীদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
লিফটের ভেতরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে পড়ে গেলে বেশ কিছু অত্যন্ত জরুরি বিষয় মেনে চলতে হয়। প্রথমত, কোনো অবস্থাতেই চরম আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। ভয় পেয়ে বা উত্তেজিত হয়ে দরজায় বিকট শব্দে ধাক্কাধাক্কি কিংবা ভেতরে লাফালাফি করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন। মনকে শান্ত রেখে ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং নিজের মনকে দৃঢ়তার সাথে বোঝান যে, আধুনিক প্রতিটি লিফটেই আটকে পড়া যাত্রীদের নিরাপদে বের করে আনার ও উদ্ধারকর্মীদের সংকেত পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা রাখা থাকে। দ্বিতীয়ত, লিফটের ভেতরের কন্ট্রোল প্যানেলে থাকা ‘বেল’ বা জরুরি অ্যালার্ম বোতামটি শক্ত করে চাপুন। এই অ্যালার্মের শব্দ বাইরের দিকে বাজার সাথে সাথে ভবনে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী বা সংশ্লিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ আপনার আটকে পড়ার বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন। তৃতীয়ত, লিফটের ভেতরে থাকা অভ্যন্তরীণ ইন্টারকম টেলিফোন ব্যবস্থা ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে ভবনের কেয়ারটেকার বা নিরাপত্তাকর্মীকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে অবগত করুন। কথা বলার সময় আপনি ঠিক কোন লিফটে এবং আনুমানিক কোন তলার মাঝামাঝি স্থানে আটকে পড়েছেন, তা স্পষ্ট ভাষায় জানাবেন।
চতুর্থত, আপনার কাছে থাকা মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক যদি সঠিকভাবে সচল থাকে, তবে অবিলম্বে ভবনের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী, পরিবারের কোনো সদস্য বা পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে ফোন দিয়ে বিপদের কথা জানান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রয়োজন মনে করলে আপনি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় জাতীয় জরুরি সেবা কেন্দ্রে ফোন দিয়ে সাহায্য চাইতে পারেন এবং নিজের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেন। পঞ্চমত, লিফটের ভেতরের সব আলো একদম নিভে গিয়ে অন্ধকার নেমে এলে ভীতিগ্রস্ত না হয়ে নিজের মোবাইল ফোনের টর্চের আলো জ্বালিয়ে নিতে পারেন। তবে ব্যাটারির চার্জ দীর্ঘ সময় ধরে সচল রাখতে টানা আলো না জ্বালিয়ে শুধু অতি প্রয়োজনে মাঝে মাঝে টর্চ ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ষষ্ঠত, লিফটের ভেতরে সারাক্ষণ অযথা হাঁটাহাঁটি বা নড়াচড়া করবেন না। সম্ভব হলে লিফটের পেছনের শক্ত দেয়ালে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে স্থির হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান কিংবা ধীরে ধীরে নিচে বসে পড়ুন এবং উদ্ধারের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন।
সপ্তমত, শারীরিক ও মানসিক উদ্বেগ কিংবা অস্থিরতা কমানোর জন্য গভীর মনোযোগের সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন। ভয় বা বুক ধড়ফড় করা বাড়লে এক থেকে একশ পর্যন্ত মনে মনে গুণতে পারেন অথবা ফোনে কোনো পরিচিত প্রিয়জনের সাথে কথা বলে নিজের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। সবশেষে, ইন্টারকম বা অ্যালার্মের সাহায্যে যোগাযোগের পর পূর্ণ ধৈর্য ধরে বাইরে থেকে সাহায্য আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এমনকি লিফট যদি হঠাৎ নিজে থেকে চালুও হয়ে যায়, তবুও কোনো পেশাদার ব্যক্তির সহায়তা ছাড়া নিজ থেকে দরজা খুলে তড়িঘড়ি করে বের হওয়ার বিপজ্জনক চেষ্টা করা যাবে না। কারণ এসব জরুরি অ্যালার্ম বা ফোনকল শুধু তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকারীদের সতর্ক করে, যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি রাতারাতি দূর করতে পারে না।
একই সাথে লিফটে আটকে থাকার সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু কাজ করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। লিফটের থমকে যাওয়া দরজা নিজে থেকে দুই হাতে টেনে খোলার চেষ্টা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ হঠাৎ যদি লিফট পুনরায় চালু হয়ে যায়, তবে অঙ্গহানি বা মৃত্যুর মতো মারাত্মক দুর্ঘটনার চরম ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, লিফট যদি দুটি ফ্লোরের মাঝামাঝি স্থানে আটকে থাকে, তবে দরজার সামান্য ফাঁক গলে নিচে নামার বা বের হওয়ার চেষ্টা কখনোই করবেন না; এতে ভারসাম্য হারিয়ে লিফটের গভীর গর্তে পড়ে গিয়ে করুণ পরিণতি হতে পারে। এমনকি লিফটের ছাদের ওপর থাকা জরুরি হ্যাচ দিয়ে বাইরে আসার চেষ্টা করাও সমান ঝুঁকিপূর্ণ, যা অভিজ্ঞ উদ্ধারকারী ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য একেবারেই অনুচিত। এছাড়া লিফট সচল করার উদ্দেশ্যে ভেতরে কোনোপ্রকার লাফালাফি, বিকট শব্দে ধাক্কাধাক্কি বা বৈদ্যুতিক প্যানেলে কারসাজি করা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। মনে রাখবেন, আতঙ্কের মুখে নেওয়া সামান্য একটি ভুল সিদ্ধান্ত জীবন বিধ্বংসী বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই নিজে থেকে কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ না নিয়ে নিরাপদে উদ্ধার হওয়াই হচ্ছে একমাত্র সঠিক উপায়।