আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০০ জনে পৌঁছেছে। প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে যাওয়া মানুষের সন্ধানে বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোতে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপালের দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা তাদের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য বিবরণীতে জানিয়েছে, বন্যাকবলিত বিভিন্ন স্থান থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ এখনও ১ হাজার ৯২৪ জন মানুষ সম্পূর্ণ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে একটি বড় অংশই বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থী। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ১৫ হাজার সশস্ত্র সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে নেপাল পুলিশ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ৫৭৫ জন, যারা বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৬টি ভিন্ন দেশের নাগরিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের পর্যটকরা। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় ভারতের সর্বোচ্চ ১৮৩ জন নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ জন, ইউক্রেনের ৬২ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিকের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এই বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার পেছনের প্রধান কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস যে অঞ্চলে আঘাত হেনেছে, তার ঠিক লাগোয়া সীমানাতেই অবস্থিত চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বত। তিব্বতের এই সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র তীর্থস্থান কৈলাস মানস সরোবর অবস্থিত। প্রতি বছর ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও পর্যটক পরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই স্থানটিতে পরিদর্শনে আসেন। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় যখন আঘাত হানে, তখন সেই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক পর্যটক উপস্থিত ছিলেন, যার ফলেই এক জায়গায় এত বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
দু দুর্যোগের সূত্রপাত হয় গত বুধবার সকালে। নেপালের রাসুয়া জেলার দিকে হঠাৎ করেই তীব্র পাহাড়ি ঢল ধেয়ে আসে। অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে মুহূর্তের মধ্যে ত্রিশূলি এবং নারায়নি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ভটকোশি নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ফুলেফেঁপে ওঠে। পাহাড়ের উঁচু ঢাল থেকে তীব্র বেগে নেমে আসা বৃষ্টির পানির সঙ্গে যুক্ত হয় পাহাড়ি ভূমিধসের হাজার হাজার টন কাদামাটি ও বিশাল বিশাল পাথর।
পাহাড়ি ঢল ও কাদামাটির সম্মিলিত এই তীব্র প্রবাহের শক্তি এতই ধ্বংসাত্মক ছিল যে, এটি তার পথে আসা সমস্ত অবকাঠামোকে মুহূর্তের মধ্যে গুড়িয়ে দেয়। নদী তীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকার হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সড়ক, শক্তপোক্ত সেতু, বিশাল গাছপালা এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে ভেসে যায়। যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকা পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে একই আকস্মিক বন্যার প্রভাব পড়েছে পার্শ্ববর্তী চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত অঞ্চলেও। চীনা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলো এই ভয়াবহ ঢলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিব্বত অঞ্চলে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। তিব্বত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে তিনজনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছিল। যদিও পরবর্তীতে নতুন করে কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তবে চীনের প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে পাহাড়ি এই ভয়াবহ বন্যায় অঞ্চলটিতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো পরিস্থিতি উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
(সূত্র: বিবিসি)