ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চলমান উদ্ধার কাজে বিদেশি বিশেষায়িত বাহিনীর অংশগ্রহণের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ার মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে নেপাল সরকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপের মুখে নেপাল সরকারের নীতি নির্ধারকরা জানিয়েছেন, কাঠমান্ডু অবশেষে নেপালের নির্দিষ্ট কিছু দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদেশি উদ্ধারকারী দল এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের কাজ করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করবে।
গত ২৬ আগস্ট বুধবার হিমালয় অঞ্চলের ভোতিকোশি এবং তার প্রধান শাখানদী লেহন্দে নদীতে গঠিত একটি বিশাল প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার হ্রদ আচমকা ভেঙে পড়ায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব শুরু হয়। এই দুর্যোগের ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সংলগ্ন রাসুয়া জেলা এবং ভৌগোলিক সীমান্তের অপর পাশে অবস্থিত চীনের তিব্বতের গিরং জেলা। পাহাড় থেকে নেমে আসা লাখ লাখ ঘনমিটার পানির তোড়ে এবং তার সঙ্গে বয়ে আসা শত শত টন কাদা, পাথর ও জঞ্জালে নিমেষেই প্লাবিত ও ঢেকে যায় দুই দেশের সীমান্তবর্তী দুটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা।
কাঠমান্ডু ও বেইজিং প্রশাসনের যৌথ হিসাব অনুযায়ী, ভয়াবহ এই আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানের জেরে শুধু নেপালে নিখোঁজ হয়েছেন ১ হাজার ৯২৪ জন মানুষ। অন্যদিকে চীনের তিব্বতে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫৮ জনে। পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে কিংবা বানের সঙ্গে আসা ঘন কাদা, পাথর ও জঞ্জালের তলায় চাপা পড়ে তারা তলিয়ে গেছেন। নিখোঁজ হওয়া এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে নেপালি ও তিব্বতি স্থানীয় অধিবাসীদের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩৫টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
এমন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজে নেপালের নিজস্ব বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান ও অনুসন্ধানের জন্য কাঠমান্ডুকে সহায়তার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ। কিন্তু কাঠমান্ডু শুরুতে সেই সমস্ত প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানায়, দুর্গম এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা সফলভাবে পরিচালনার জন্য নেপালি সামরিক ও উদ্ধারকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে। ফলে এক্ষেত্রে বিদেশি কোনো উদ্ধারকারী দলের সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, নেপালি উদ্ধারকারী বাহিনী নিজ দক্ষতার সঙ্গেই উদ্ধারকাজ সামলাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আসা কূটনৈতিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় নেপাল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিখোঁজদের তালিকায় নিজ দেশের বহু নাগরিক অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসে কিছু বিশেষ ও নির্ধারিত এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী দলকে অনুসন্ধান কাজের জন্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
(সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট)